logo

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী, প্রস্তুত ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী, প্রস্তুত ইরান

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এতে ইরান নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি তেহরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকির আশঙ্ক আরও বেড়েছে।

সিএনএন ও দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আওতাধীন। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে সাধারণত একটি বিমানবাহী রণতরী, গাইডেড মিসাইল ক্রুজার, বিমান-বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী ডেস্ট্রয়ার বা ফ্রিগেট অন্তর্ভুক্ত থাকে। যদিও মার্কিন নৌবহর এখনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। তবে তারা ইরানের ওপর আঘাত হানার পরিসীমার মধ্যেই রয়েছে। 

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এমন সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, যা কেবল সামরিক নয়— বরং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে একটি বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে হামলার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করলেও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষের অনুমতির প্রয়োজন পড়বে না।

এরই মধ্যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে একটি মহড়ার ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, এই মহড়ার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত যুদ্ধবিমান মোতায়েন, ছড়িয়ে দেওয়া ও দীর্ঘসময় অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন করা।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার ৪০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর ঘটনা যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় রয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মাই সাতো এই সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বিক্ষোভকারীদের হত্যার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন, বারবার হুমকি দিয়েছেন যে যদি তারা তা করে তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে।

ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো ইঙ্গিত না থাকায় সোমবার ইরানের শেয়ারবাজার এক দিনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়ে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি অভিযোগ করেছেন, সামরিক হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামাজিক ঐক্য ভাঙার কৌশল নিয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘একটি দেশে জরুরি অবস্থা জারি থাকা মানেই এক ধরনের যুদ্ধ, আর শত্রুরা এটাই চেয়েছিল। এবারের মার্কিন কৌশল হলো- আগে সামাজিক ঐক্য ধ্বংস কর, তারপর সামরিক হামলা চালাও।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে যোগাযোগ করার খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি সামরিক গতিবিধি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো দেশে সেনাবাহিনী পাঠানো ও হুমকি দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী। 

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো ধরনের নিয়মভঙ্গ করা হয় তাহলে সবার উপর নিরাপত্তাহীনতা নেমে আসবে। যে কোনো আগ্রাসনের ব্যাপক ও অনুশোচনাজনক প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।

ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই দেশটিকে আলোচনার টেবিলে না ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও বিভক্তি স্পষ্ট— ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশে কার্যত সরকার পরিবর্তনের পথে এগোনো উচিত কি না, তা নিয়ে ঐকমত্য নেই।

ইরান প্রশ্নে ইউরোপও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসকে (আইআরজিসি) ইউরোপে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণার প্রস্তাব তুলবেন।