সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলন যেভাবে ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার পতন ঘটাল

দুর্নীতি ও সরকারি অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের রাজনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নির্বাচনে এগিয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় দুপুরের আগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত জোট পেয়েছে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।
অন্যদিকে ভুচিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ফলে সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ নোভি সাদ ও নিশের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকরা জড়ো হয়ে উল্লাস করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, ‘সার্বিয়া স্বাধীন’।
নির্বাচনের পর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল বেলগ্রেডের পাইওনিয়ার্স পার্কে অবস্থিত ‘চাচিল্যান্ড’ নামের তাঁবুশিবিরের পতন। প্রায় ১৮ মাস আগে সার্বিয়ার পার্লামেন্টের সামনে গড়ে তোলা এই শিবিরটি ভুচিচপন্থিদের সমর্থনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর সেখানে থাকা ধাতব বেড়া ভেঙে ফেলার সময় বিক্ষোভকারীরা ‘ভুচিচ চলে যাচ্ছেন’ বলে স্লোগান দেন।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে আন্দোলনের সূচনা
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের রেলস্টেশনের বাইরে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন।
ঘটনাটি দেশটির দুর্নীতি ও সরকারি অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে ওঠে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজে গুরুতর ত্রুটি ছিল এবং প্রকল্পটির সঙ্গে ভুচিচ সরকারের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা ছিল।
গবেষণা সংস্থা হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির বিশ্লেষক হেলেনা ইভানভের মতে, ছাউনি ধসের ঘটনাটি জনমনে জমে থাকা ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এর পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দ্রুত দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন সড়কে ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে এতে কৃষক, অভিনেতা, বিচারকসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ যুক্ত হন। আন্দোলনটি ক্রমে দুর্নীতি, জবাবদিহি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের দাবিতে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়।
নেতৃত্বহীন আন্দোলন যেভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলো
‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্ট উইন’ নামে পরিচিত এই আন্দোলনের কোনো একক, সুস্পষ্ট নেতা নেই। এর সদস্যদের অনেকেরই আগে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার অভিজ্ঞতা ছিল না। তা সত্ত্বেও তারা ভুচিচবিরোধী ভোটারদের একত্র করতে সক্ষম হন।
আন্দোলনকারীরা সংসদের ২৫০টি আসনের সবকটির জন্য প্রার্থী দিলেও নিজেদের মধ্য থেকে কোনো শিক্ষার্থীকে প্রার্থী করেননি। বরং বিভিন্ন পেশার পরিচিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। একই বছরের মার্চে বেলগ্রেডে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকে সংগঠিত রাখতে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সমাবেশ ও প্লেনামভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের বলকান কর্মসূচির প্রধান গোরদানা ডেলিকের মতে, এবারের ভোটে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি প্রধান হয়ে উঠেছিল। তার ভাষায়, নির্বাচনটি কার্যত ভুচিচ সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের গণভোটে পরিণত হয়।
গত মাসে ভুচিচ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীরা নির্বাচনি প্রস্তুতি জোরদার করেন। হেলেনা ইভানভের মতে, আন্দোলনের জনসমর্থনকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর এবং ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম প্রতিরোধে কর্মীদের প্রস্তুত করাই ছিল তাদের বড় সাফল্য।
নির্বাচনের আগে ভুচিচ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলেন। পরাজয় স্বীকার করার পরও তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর সমর্থন পেয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণের উল্লেখ করা হয়নি।
নতুন সরকারে কারা আসতে পারেন
শিক্ষার্থীরা নিজেরা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আন্দোলনের সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আন্দোলনের প্রধান প্রার্থী হিসেবে পরিচিত নোভি সাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ইলিয়া সিদানোভিচ। তবে তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিশ্চিতভাবে দেখা হচ্ছে না।
স্বাধীন জরিপ সংস্থা সিইএসআইডি ও ইপসোসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত তালিকা থেকে প্রায় ১৪০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাস্কেটবল তারকা দেইয়ান বোডিরোগা, অভিনেতা তিহোমির স্তানিচ, অপেরা শিল্পী নিকোলা মিকিচ এবং সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেইয়ান শশকিচ। তালিকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষাবিদও রয়েছেন।
অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ায় শশকিচের নাম সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন সরকারের শীর্ষ পদগুলোতে কারা দায়িত্ব পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
দুর্নীতি দমন ও গণমাধ্যম সংস্কারে ১১ দফা পরিকল্পনা
নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের সামনে এখন আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ১১ দফা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দুর্নীতি মোকাবিলা করা।
কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠন।
বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নে নিয়ম ভঙ্গকারী এবং সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ।
পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যমের সংস্কার এবং সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধ করা।
ভুচিচ ও তার দল দুর্নীতি এবং গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা
নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্য আন্দোলনের জন্য বড় অর্জন হলেও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের রাজপথের আন্দোলনের দাবিগুলো এখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে আন্দোলনের নেতারা নিজেরা সংসদে না থাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর তাদের কর্মসূচি অনুসরণের চাপ বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, ভুচিচ তার দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সার্বিয়ার গত দুই বছরের জীবনযাত্রা ও স্থিতিশীলতার ক্ষতি করেছে। তিনি আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবেন বলেও মন্তব্য করেছেন।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এই উত্থান সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনী সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে তারা দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
