logo

বিদ্যুৎ শুল্ক নিয়ে বাংলাদেশ-আদানি বিতর্ক গড়াচ্ছে আদালতে

বিদ্যুৎ শুল্ক নিয়ে বাংলাদেশ-আদানি বিতর্ক গড়াচ্ছে আদালতে

বাংলাদেশ ও ভারতের আদানি পাওয়ারের মধ্যে কয়লার দাম ও বিদ্যুৎ শুল্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবার আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের পথে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পক্ষে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে প্রতিনিধিত্ব করতে একটি শীর্ষ ব্রিটিশ আইন সংস্থাকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ।

একই সময়ে, বিতর্কিত চুক্তি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মামলা নতুন করে বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছেন, লন্ডনভিত্তিক আইন সংস্থা থ্রিভিপি চেম্বার্সকে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্রে (এসআইএসি) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক ও আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আদানি পাওয়ারকে ৩৮৪ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যা মোট বকেয়া অর্থের বড় অংশ। তবে ভারতীয় জ্বালানি জায়ান্টটি বিতর্কিত কয়লা শুল্কের বিষয়ে আরও প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার দাবি করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিংস কাউন্সেল ফারহাজ খানের নেতৃত্বাধীন থ্রিভিপি চেম্বার্স কয়েক মাস ধরে আদানি চুক্তি পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিকে পরামর্শ দিয়ে আসছিল। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি নিয়ে কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই আইন সংস্থাকে নিয়োগ দেওয়া হলো।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর সিঙ্গাপুরে আদানি পাওয়ারের মধ্যস্থতার উদ্যোগের পর ব্রিটিশ আইন সংস্থাকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পূর্ণ সালিশ প্রক্রিয়ার আগে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক হলেও তা বাধ্যতামূলক রায় নয়।

বাংলাদেশের অভিযোগ, আদানি কয়লার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-নেতৃত্বাধীন সহিংস আন্দোলনে হাসিনার সরকারের পতনের পর বিপিডিবি আদানির সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনার চেষ্টা জোরদার করে।

এদিকে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা আদানি পাওয়ারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শক্তিশালী প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ফৌজুল কবির খান বলেন, আদানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে, এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে সেগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রমাণ আরও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠানো হয়েছে।

গত নভেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিটি জানায়, দুর্নীতির মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার প্রমাণ মিললে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বাতিল করতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে পৃথক প্রতিবেদনও প্রস্তুত করেছে।

তবে বিশিষ্ট আইনবিদ শাহদীন মালিক সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি চুক্তি বাতিলের আইনি ভিত্তি থাকলেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করা হতে পারে।

আদানি ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। বাংলাদেশ ২০২৫ সালের জুনে এককালীন ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে ওই বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বকেয়া নিষ্পত্তি করে। এর আগে বকেয়া পরিশোধে বিলম্বের কারণে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। তবে পাওনা পরিশোধের পর পূর্ণ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়।