logo

চীন-যুক্তরাষ্ট্রই কি চালাবে পৃথিবী, চীনের উত্তর ‘না’

চীন-যুক্তরাষ্ট্রই কি চালাবে পৃথিবী, চীনের উত্তর ‘না’

দুনিয়া চালাচ্ছে, চালাবে যুক্তরাষ্ট্র আর চীন—আকারে ইঙ্গিতে এমনভাবেই ক্ষমতার দাপট প্রকাশ করতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ধারণার পোশাকি একটা নামও আছে জি-টু, বা গ্রুপ অব টু। তবে ক্ষমতার এই আলাপ আর পরিচয় ট্রাম্প যেভাবে ফলাও করে বলছেন, চীনের অবস্থান কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। নিজেদের এভাবে কি পরিচিত করতে চায় তারা, চীনের উত্তর—একেবারেই না। 

এই ‘জি-২’ ধারণার শুরু কোথায়, জানতে চাইলে পিছিয়ে যেতে হবে বছর বিশেক আগে। ২০০৫ সালে মার্কিন অর্থনীতিবিদ সি. ফ্রেড বার্গস্টেন উত্থাপন করেছিলেন ‘জি টু’ ধারণাটি—যা জি-৭ বা জি-২০ ফোরামের তুলনায় আরও সীমিত একটি কাঠামো। বলা বাহুল্য, এই দুইয়ের একটি যুক্তরাষ্ট্র আর আরেকটি চীন। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরা। শুরুতে কিছু নীতিনির্ধারক এই ধারণাকে সমর্থন করলেও পরে ওয়াশিংটনে বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকায়, বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, এই ধারণা গুরুত্ব হারায়।

তবে হারানো সেই তত্ত্বের পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মোটামুটি সাম্প্রতিক সময়েই, দক্ষিণ কোরিয়ায় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের কথা তুলতে গিয়ে ট্রাম্প বারবার ‘জি-টু’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও ‘জি-টু’র কবজায় পুরো বিশ্বের ব্যবস্থাপনা ঠিক কোনভাবে চলবে, তা নিয়ে আর কিছু বলেননি ট্রাম্প। তবে তার এই সম্বোধনেই রয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যের আভাস। কারণ, চলতি মাসের শেষ দিকে চীন সফরে গেলে ট্রাম্প আবারও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে ট্রাম্পের এভাবে আমেরিকার সঙ্গে চীনকে ক্ষমতাধর হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলার ব্যাপারে চীনের সাফ কথা—তারা আগ্রহী নয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রোববার বেইজিংয়ে চীনের বার্ষিক আইনসভা অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সোজাসাপ্টাভাবে তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। 

‘বিশ্বে চীন আর আমেরিকার যে বিশেষ প্রভাব আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, পৃথিবীতে আরও ১৯০টিরও বেশি দেশ আছে।’

এনবিসি নিউজকে উত্তরের সময় তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাস সবসময় বহু দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় রচিত হয়েছে এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎও গড়ে উঠবে সব দেশের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে।’

তিনি জানান, চীন কখনওই আধিপত্য বা সম্প্রসারণের পথ খুঁজবে না। সমতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান এক পৃথিবী গড়ে তুলতে চায় তারা। 

শক্তির প্রয়োগ এবং দখলদারিত্বের অভিপ্রায়কে সমালোচনা করে ওয়াং বলেন, ‘ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গোষ্ঠীগত মুখোমুখি অবস্থান সবসময় মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ও যন্ত্রণা বয়ে এনেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাই শক্তি বাড়লেও চীন কখনো আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সেই পুরোনো পথে হাঁটবে না। আবার পৃথিবীকে কেবল বড় দেশগুলো চালাবে, এই যুক্তিতেও আমরা বিশ্বাস করি না।’

ওয়াং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দূরপ্রসারী ও বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। আমরা যদি একে অপরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিই, তাহলে কেবল পারস্পরিক ভুল-বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাবই বাড়বে। আর সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোলে তা পুরো বিশ্বকেই বিপদের মুখে ফেলতে পারে।’ যদিও ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক চাপের মুখে পড়েছে, তবুও তিনি প্রায়ই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের দারুণ সম্পর্কের কথা বলেন। অক্টোবরে তাদের বৈঠকের পর থেকে দুই নেতা ফোনে দুবার কথা বলেছেন। বিষয়টিকে তিনি সবার জন্য একটি ভালো উদাহরণ হিসেবে মনে করেন। তিনি আরও বলেন, ‘তাদের এই যোগাযোগ চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নত ও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুরক্ষা দিয়েছে এবং ওঠানামার পর সম্পর্ককে আবারও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে।’

এ বছর ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সর্বোচ্চ চারবার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হবে ট্রাম্পের তিন দিনের চীন সফর, যা হোয়াইট হাউস জানিয়েছে ৩১ মার্চ শুরু হবে। এরপর শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফর করে পাল্টা সৌজন্য দেখাতে পারেন। এ ছাড়া তিনি ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ সম্মেলনেও অংশ নিতে পারেন। নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে আয়োজিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনেও ট্রাম্প অংশ নিতে পারেন।

ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের সম্ভাব্য একটি বাধা হতে পারে ইরানের ওপর চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা। কারণ, ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রোববার ওয়াং আবারও বেইজিংয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন সামরিক পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়ে। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ ‘কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে। আমি বলতে চাই যে এই যুদ্ধের মতো ঘটনা হওয়াটা উচিত ছিল না।’

ওয়াং আরও বলেন, ‘শক্তির অপব্যবহার’ এবং এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরোধিতা করে চীন।

ইচ্ছেমতো শক্তি প্রয়োগ করাকে তিনি সভ্য এবং আধুনিক পৃথিবীর পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘জঙ্গলের আইন যেন আবার ফিরে এসে দুনিয়া শাসন না করে তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছামতো শক্তি প্রয়োগ করা কারও শক্তির প্রমাণ হয়ে ওঠে না।’