বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট উসকে দিচ্ছে শক্তিধর দেশগুলোর ভুল হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর স্বার্থপর কূটনৈতিক মানসিকতা এবং একের পর এক ভুল হিসাবের জেরে ইরানে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নানাবিধ বিপর্যয়ের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বড় সংকটে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইদানীং গণমাধ্যমের সবচেয়ে বেশি চর্চিত বিষয়, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম। সোমবার (৯ মার্চ) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের ‘ফিউচার প্রাইস’ ২০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিত শূন্য ৪ ডলারে পৌঁছেছে এশিয়ার বাজারে। জ্বালানি তেলের এই দাম ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
অপরিশোধিত তেলের দামের এই উল্লম্ফনের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তার বিষয় পরিশোধিত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি। কারণ ভোক্তারা শেষ পর্যন্ত পরিশোধিত তেলেই ব্যবহার করে।
গত সপ্তাহে পরিশোধিত জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জেট ফুয়েলের দাম। ৪ মার্চ সিঙ্গাপুরের স্পট মার্কেটে জেট ফুয়েলের দাম ছিল রেকর্ড, ব্যারেলপ্রতি ২২৫ দশমিক ৪৪ ডলার। সপ্তাহান্তে কিছুটা কমে ১৫৫ দশমিক ৮২ ডলারে বিক্রি হলেও, এই দাম ইরানের হামলা হওয়ার আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
ডিজেল ও জেট ফুয়েল তৈরির মূল উপাদান গ্যাসঅয়েলের দামও ৪ মার্চ ব্যারেলপ্রতি ১২৩ দশমিক ৩৯ ডলারে ওঠে, যা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ এবং হামলার আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের একটি প্রধান কারণ, হরমুজ প্রণালীর কার্যত অচল হয়ে পড়া। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বাকি ৩০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করছে, প্রণালীটি এখনো খোলা রয়েছে। তাছাড়া যুদ্ধাবস্থায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করা জাহাজগুলোর জন্য বিমা সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তবু ইরানের হামলার আশঙ্কায় প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজই চলাচল করছে না।
বাস্তবে ইরানের ওপর হামলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। হামলার পরপরই হরমুজ অবরুদ্ধ করে ইরান। ফলে যুদ্ধের দশম দিনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এখন ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক এবং সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলোর ধারণা ছিল, আগের সংঘাতগুলোর মতো এবারও সবাই তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামো বাঁচিয়ে যুদ্ধ করবে। কারণ তেলের প্রবাহ বন্ধ হওয়া সবার স্বার্থের জন্যই ক্ষতিকর। কিন্তু বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করে এবং সরকার পরিবর্তনের হুঁশিয়ারি দেয়, তখন তারা সব সাধারণ প্রত্যাশা উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করে বসে। ফলে পাল্টে যায় সব হিসাব।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ইরাক মূলত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সংঘাতে তাদের আয়ের বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল হিসাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা কখনোই ভাবেনি, হরমুজ আক্ষরিক অর্থেই বন্ধ হয়ে যাবে, এমনকি তাদের প্রস্তাব করা সাময়িক সমাধানগুলোও কাজে আসবে না। কেননা, জাহাজের জন্য বিমা সুবিধা দেয়া বা সমুদ্রে পাহারা বসানোর প্রস্তাব এক ব্যাপার, আর শত শত জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইরান যদি একটি পূর্ণ তেলবাহী ট্যাংকারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুতই যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ আকার ধারণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পদক্ষেপ, ভারতকে আবার রুশ তেল কেনার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও অনেকটা হাতিকে বিস্কুট খাওয়ানোর মতো। বিষয়টি শুনতে ভালো হলেও আসলে তেমন একটা কার্যকর নয়।
এদিকে এশিয়ার শোধনাগারগুলো এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে অন্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এর সম্ভাব্য ফল হলো, তেলের দাম আরও বাড়বে। আর যত দিন প্রণালীটি বন্ধ থাকবে, অঞ্চলটি ততই অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি ঘাটতির দিকে অগ্রসর হবে।
সম্ভাব্য এই সংকটের প্রতিক্রিয়ায় অনেক রপ্তানিকারক দেশ নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিতে পারে, যা পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেবে।
খবরে বলা হয়েছে, চীন তাদের বড় রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলোকে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। ভারতের কিছু শোধনাগারও জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করছে, উৎপাদন কমাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু কারখানাও।
অবশ্য চীনের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে—আমদানিকারক দেশগুলোকে সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত চীনের অর্থনীতির ওপরই কত দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা।
ভুল হিসাবের এটিও একটি উদাহরণ হতে পারে। কারণ চাহিদা মেটাতে জ্বালানি রপ্তানি কমানো নয়, বরং বাড়ানোই বেশি কার্যকর হতে পারত।
চীন পরিশোধিত জ্বালানির বড় রপ্তানিকারক দেশ নয়। প্রতিদিন তারা মোটামুটি ৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। তবে ধারণা করা হয়, তাদের কাছে বিপুল তেল মজুত রয়েছে। এই পরিমাণ হতে পারে এক বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি। এই মজুত দিয়ে দেশটি তিন বছর তেল পরিশোধন চালিয়ে যেতে পারবে।
অর্থাৎ চীন চাইলে এই মজুত ব্যবহার করে শোধনাগারের উৎপাদন বাড়াতে পারে, রপ্তানি বাড়াতে পারে এবং সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটও কিছুটা কমাতে পারে। এতে তারা লাভও হবে, আবার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।
এশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি আমদানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানি করে। যদি কখনো এই তেলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সংকটে পড়তে পারে বড় অর্থনীতির এই দেশটি।
তবে এমন পরিস্থিতি তখনই তৈরি হতে পারে, যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে এবং দেশগুলো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা অব্যাহত রাখতে থাকে।
কিন্তু সমস্যা হলো, রাজনৈতিক নেতারা সম্ভবত এখনো বুঝতে পারছেন না, তারা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কত বড় চাপ সৃষ্টি করছেন। তাদের অনেকের সিদ্ধান্ত দেখে মনে হচ্ছে, তারা কেবল নিজেদের দেশের প্রয়োজনই দেখছেন। অথচ বাস্তবে এটি বৈশ্বিক সংকট, যার সমাধানও বৈশ্বিক পর্যায়েরই হওয়া দরকার।
লেখক: পণ্য ও জ্বালানি বিষয়ক কলামিস্ট
রয়টার্সে প্রকাশিত ‘কম্পাউন্ডিং এররস অ্যান্ড ন্যারো সেল্ফ-ইন্টারেস্ট থ্রেটেন গ্লোবাল ফুয়েল ক্রাইসিস’ শীর্ষক কলাম অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]