ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারতে শি জিনপিং

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শনিবার দিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে তার বিমান অবতরণ করে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। ২০১৯ সালের পর এটি শি জিনপিংয়ের প্রথম ভারত সফর। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁর এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
শির সঙ্গে চীনের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলও ভারতে এসেছে। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাধারণ কার্যালয়ের পরিচালক ছাই ছি এবং পলিটব্যুরোর সদস্য ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
ভারত, রাশিয়া ও ইরানসহ ১১ সদস্যের জোটের এবারের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ব্রিকসের আলোচনার বাইরেও শির ভারত সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় শির সফরকে এখন পর্যন্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ, ভিসা কার্যক্রম এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়েছে। শুক্রবার চীন জানিয়েছে, ভারত ও চীন পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়ানো, সহযোগিতা জোরদার করা এবং মতপার্থক্য যথাযথভাবে সামাল দিতে প্রস্তুত।
তবে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এখনো সমাধান হয়নি। তিব্বতসংলগ্ন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম সীমান্ত এলাকায় দুই দেশই বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছে।
মোদি-শি বৈঠকে সীমান্ত ইস্যুতে নজর
শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে শি জিনপিংয়ের। বিশ্লেষকদের ধারণা, আলোচনায় সীমান্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও গুরুত্ব পাবে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন-ভারত সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ প্রদীপ তানেজার মতে, সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে একই সময়ে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন।
সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুই দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও পারস্পরিক অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ।
এদিকে শির সফরের প্রতিবাদে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক ডজন তিব্বতি। তাদের হাতে চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের বিরোধিতা করে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ছিল। ১৯৫৯ সালে চীনা দমন-পীড়নের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া দালাই লামার অনুসারীরাও বিক্ষোভে অংশ নেন।
রাশিয়া-ইরান ইস্যুতে ভারসাম্যের কূটনীতি
ব্রিকস সম্মেলনের আগে শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতাও অব্যাহত রেখেছে ভারত।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর ইরানের ওপর চাপ গুরুতর ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ভারত একই সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসে মতপার্থক্যের আশঙ্কা
পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এই জোটের অংশ।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান অভিন্ন নয়। ফলে এবারের সম্মেলনে যুদ্ধ ইস্যুটি জোটের অভ্যন্তরে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি করতে পারে।
সম্মেলনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা। প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা দেশে আসন্ন নির্বাচনের প্রচারে ব্যস্ত থাকায় সম্মেলনে থাকছেন না।
এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সদস্য দেশগুলো কোনো যৌথ বিবৃতিতে পৌঁছাতে পারেনি।
ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞ হর্ষ ভি. পান্তের মতে, এবারের সম্মেলনে উপসাগরীয় যুদ্ধ ব্রিকসের সবচেয়ে বড় বিভাজনরেখা হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, গত বছর পর্যন্ত জোটের সম্প্রসারণকে সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সদস্যদের ভিন্নমতই ব্রিকসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


