logo

আদালতের রায়ের পর ভারতীয় যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ কার্যকর

আদালতের রায়ের পর ভারতীয় যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ কার্যকর

আদালতের রায়ের পর এক ভারতীয় যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ কার্যকর করা হয়েছে। ওই যুবকের বাবা-মায়ের আবেদন সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণ করার পর তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ওই যুবক মারা যান।

নিহত যুবকের নাম হরিশ রানা। তার মৃত্যুর ঘটনাটি ভারতে আদালত-অনুমোদিত প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার (জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহার বা বন্ধ করার কাজ) প্রথম দৃষ্টান্ত।

বুধবার (২৫ মার্চ) বিবিসি জানিয়েছে, ৩১ বছর বয়সি রানা মঙ্গলবার দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস) হাসপাতালে মারা যান, যেখানে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার পর তাকে উপশমমূলক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এভাবে আদালতের রায়ের পর ওই ভারতীয় যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ কার্যকর করা হয়েছে। 

২০১৩ সাল থেকে রানা কোমায় ছিলেন। তিনি চতুর্থ তলার বারান্দা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এরপর তিনি কোমায় চলে যান। ওই সময় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

দুর্ঘটনার আগে রানা কোনো উইল করেননি। এ কারণে তার চিকিৎসার জন্য কোনো নির্দেশাবলী উল্লেখ করা ছিল না।

ভারতে 'লিভিং উইল' নামে পরিচিত আইনি দলিলটি ১৮ বছরের বেশি বয়সি যে কোনো ব্যক্তিকে কিছু ক্ষমতা দেয়। যদি তিনি এমন কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি বা অবস্থায় আক্রান্ত হন যেখান থেকে সেরে ওঠার কোনো আশা নেই, তাহলে তিনি কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পেতে চান, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয় এ আইন।

২০১৮ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট মানুষকে ‘লিভিং উইল’ বা জীবনকালীন ইচ্ছাপত্র তৈরির অনুমতি দিয়ে পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুকে বৈধতা দেয়। ভারতে সক্রিয় ইচ্ছামৃত্যু—অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তিকে আত্মহত্যা করতে সাহায্য করার যে কোনো কাজ অবৈধ।

কিন্তু যেহেতু রানার কোনো 'লিভিং উইল' ছিল না এবং কোমায় থাকায় লাইফ সাপোর্ট থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেওয়ার ক্ষমতাও তার ছিল না, তাই তার বাবা-মা ছেলের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা বন্ধ করার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।

এর আগে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা বলেছেন, ছেলের যত্ন নিতে গিয়ে তাদের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। তাদের মৃত্যুর পর ছেলের কী হবে, তা নিয়েও তারা চিন্তিত ছিলেন।

রানার বাবা-মা প্রথমে ২০২৪ সালে তাদের ছেলের জন্য পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে যান। কিন্তু তাদের আবেদন এই যুক্তিতে খারিজ করে দেওয়া হয় যে, সেই সময়ে রানাকে কোনো লাইফ-সাপোর্ট মেশিনে রাখা হয়নি। তাই আদালতের মতে, রানা কোনো বাহ্যিক সাহায্য ছাড়াই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এরপর তারা সুপ্রিম কোর্টে যান, যেখান থেকেও তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।

২০২৫ সালে তারা আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং জানান যে, তাদের ছেলের অবস্থার অবনতি হয়েছে। এখন রানাকে লাইফ সাপোর্ট মেশিনের মাধ্যমে ‘কৃত্রিমভাবে’ বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে।

দুটি মেডিকেল বোর্ড রানার অবস্থা মূল্যায়ন করার পর সুপ্রিম কোর্ট তাদের মামলাটি বিবেচনা করতে রাজি হয়। ভারতের লিভিং উইল সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, লাইফ সাপোর্ট তুলে নেওয়ার জন্য একজন রোগী যে শর্ত পূরণ করেছেন, সে বিষয়ে দুটি মেডিকেল বোর্ডের প্রত্যয়ন আবশ্যক।

উভয় বোর্ডই জানায় যে, রানার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে এবং তার খাওয়া, মূত্রত্যাগ ও মলত্যাগের জন্য বাহ্যিক সহায়তার প্রয়োজন। বোর্ডগুলো আরও উল্লেখ করে যে, তার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে এবং তার শরীরে বড় বড় বেড সোর বা শয্যাক্ষত তৈরি হয়েছে।

১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করে যে, রানা চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন না। এরপর মেডিকেল বোর্ডগুলোকে এই বিষয়ে ‘তাদের চিকিৎসাগত বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ’ করতে বলে।

এরপর তাকে তার বাড়ি থেকে এইমস-এর প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি মারা যান।