কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ‘হস্তক্ষেপ’, নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে আরএসএস ঘনিষ্ঠ সংগঠন

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার ৫০তম বর্ষে এসে এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা এবার এক নতুন মোড় নিল। টানা প্রায় পাঁচ দশক ধরে বইমেলা সফলভাবে আয়োজন করে আসছে ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’। তবে আগামীতে এই মেলার নিয়ন্ত্রণ গিল্ডের হাতেই থাকবে নাকি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সরাসরি এর দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে তীব্র জল্পনা চলছিল।
অবশেষে সোমবার (২৯ জুন) একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের হাত ধরে এই বিষয়ে কিছু স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। কট্টরপন্থি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) তথা বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) ঘনিষ্ঠ নতুন সংগঠন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ’ (বিজিপি) বইমেলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে পারে।
গত কয়েক বছর ধরেই গিল্ডের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশক, কবি এবং সাহিত্যিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন একটি সংগঠন ‘মুদ্রক, প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতার মহাসংঘ, বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ’। এই সংগঠনটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএএস) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
গতকাল সোমবার মহাজাতি সদনে প্রয়াত প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল নবগঠিত এই পরিষদ। অনুষ্ঠানটিতে রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক মহলের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়, যা বইমেলার ভবিষ্যৎ সমীকরণ নিয়ে বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, আরএসএসের পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের সহ-প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু, রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার, কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহর কন্যা মালিনী গুহ, এই সংগঠনের সভাপতি নির্গুণানন্দ ব্রহ্মচারী, সপ্তর্ষি চৌধুরীসহ গিল্ডের দুই শীর্ষ কর্তা, সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু শেখর দেসহ শতাধিক সাহিত্যিক ও প্রকাশক।
অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যের শমীক ভট্টাচার্য গিল্ড কর্তাদের উপস্থিতিতেই একটা বিষয় স্পষ্ট করে দেন যে, বইমেলা আয়োজক সংস্থা হিসেবে গিল্ডের একাধিপত্যের দিন ফুরোতে চলেছে। একইসঙ্গে ৫০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ বিজেপি ঘনিষ্ঠ কোন সংগঠন হাতে নেবে না, এমন সম্ভাবনা নেই বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বইমেলা আয়োজন সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না, সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি।
তবে বইমেলা আয়োজনে গিল্ডকে ‘মিলেমিশে আয়োজন’ করতে হবে ও এই বিষয়ে নতুন কোনো ব্যবস্থা আসতে চলেছে বলে স্পষ্ট বার্তা দেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে বইমেলা বা প্রকাশকদের ওপরে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে আজকের সভায় আসিনি। আমরা চাই, বইমেলাই হোক বা প্রকাশকই হোন, সবাই মিলেমিশে আমরা নতুনভাবে কিছু মানুষের সামনে উপস্থাপিত করব।’
শমীক বলেন, এই বইমেলাতে লাইন দিয়ে পাঠক বই কেনেন, এটা অন্য কোন বইমেলায় দেখা যায় না। একাধিক বিষয়ে এই মেলা নিয়ে ক্ষোভ থাকে। বইমেলায় জায়গা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ, সংগঠনে বিচ্যুতি কাঙ্খিত না হলেও, তা ঘটেই থাকে। সেই জায়গা কাটিয়ে উঠতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বইমেলায় রাজনৈতিক একাধিপত্য চলতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জায়গা বইমেলা নয়। যে যার মতো যাতে মতপ্রকাশ করতে পারেন তার জন্য পরিসর দিতে হবে। সাহিত্য জগতে দীর্ঘদিন একটা অস্পৃশ্যতা কাজ করেছে। মতপ্রকাশের অধিকার তো সকলের আছে। আমরা চাই, আগামী দিনে যে বইমেলাটা হবে, সে বইমেলায় যেন সম্পূর্ণ একটা ভারতীয়ত্বের ছাপ থাকে।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সভাপতি বলৈন, রাজ্যে এতদিন যে দল সরকারে এসেছে, সেই দলের হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এখন এমন একটি সরকার তৈরি হয়েছে, যারা কোনো দলের সরকার হবে না, মানুষের সরকার হবে। আজ এখানে আমি দলের প্রতিনিধিত্ব করছি। কিন্তু সরকারের কোনও প্রতিনিধিত্ব থাকলে ভালো হতো আপনাদের অনেকের অনেক অভিযোগ আছে, অভিমান আছে। সরকারের প্রতিনিধি থাকলে আপনার তাদের কাছে তুলে ধরতে পারতেন।
তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত প্রত্যেকের। আমরা চাই যে কোনো ভাবনার সাহিত্যচর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং জায়গা থাকা উচিত। একজন বামপন্থি মানুষ মার্ক্সীয় সাহিত্য চর্চা করবেন, বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।
আরএসএসের ঘনিষ্ঠ সংগঠনের বক্তব্য
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনার মাঝেই এক নতুন তথ্য সামনে এনেছে আরএসএস ও বিজেপি ঘনিষ্ঠ নবগঠিত সংগঠন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ’। সংগঠনের উদ্যোক্তাদের দাবি, এই মঞ্চ তৈরির পরিকল্পনা তাদের দীর্ঘদিনের, যা মূলত আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রবাদ এবং বহুত্ববাদের আদর্শ থেকে এসেছে।
গত ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের পর, ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন এবং সম্প্রতি বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিবস উদযাপনের মাধ্যমে তারা নিজেদের উপস্থিতি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
নতুন এই সংগঠনটিই এবার বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নেবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়ে সংগঠনের নেতা সপ্তর্ষি চৌধুরী সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলেছেন, ‘সময় বলবে।’
তবে সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বিজেপি নেতা দেবজিৎ সরকার পরিষ্কার জানিয়েছেন, বইমেলার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি হাতে না নিলেও, এবারের মেলা যেন তাদের ‘মনের মতো’ হয়। তিনি বলেন, বইমেলা বা শিল্প-সংস্কৃতির কোনো জায়গায় মুক্ত চিন্তায় বাধা থাকা উচিত নয় এবং এবারের ৫০তম বইমেলায় সবাই মিলে সেই মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ঘটাবেন।
তবে গিল্ডকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া যে যৌক্তিকভাবে সম্ভব নয়, তা স্পষ্ট করেছেন নতুন সংগঠনের আরেক নেতা অনির্বাণ। তিনি জানান, গিল্ড যেমন কতগুলো প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে তৈরি একটি বেসরকারি সংগঠন, তাদের পরিষদও তাই। তফাত শুধু একটাই গিল্ড মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক, আর নতুন এই সংগঠনটি জেলার প্রকাশকদেরও এক ছাতার তলায় আনছে। তাই একটি বেসরকারি সংগঠন অন্যটিকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, বরং সবাইকে একসঙ্গেই চলতে হবে।
এদিকে গিল্ডের শীর্ষ কর্তা সুধাংশু শেখর দে-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নতুন এই সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলা করতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তিনি জানান, মেলা আরও ভালো করার জন্য নতুন কেউ এগিয়ে এলে তাকে স্বাগত জানানোই উচিত। আগে যেখানে ৯টি সংগঠন মিলে বইমেলা করত, এবার নতুন চারটি যুক্ত হয়ে মোট ১৩টি সংগঠন একসঙ্গে কাজ করবে। মেলা নিয়ে আসা বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে তারা আলোচনা করবেন।
