ইরানের সেই ইউরেনিয়াম ছিনিয়ে আনতে বিশেষ বাহিনী পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প

ইরানের পারমাণবিক বানানোর উচ্চাক্ষাঙ্ক্ষা চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর গোপন পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যৌথ হামলা পরবর্তী এই যুদ্ধ আজ নয় দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে ইরানের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কবজায় নিতে বা ধ্বংস করতে এই সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
এই আলোচনার বিষয়ে অবগত চারটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের স্বপ্ন চিরতরে বিলিন করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে ইরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম বড় বাধা। ইরানের কাছে থাকা এই ইউরেনিয়াম আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অস্ত্র তৈরির উপযোগী গ্রেডে রূপান্তর করা সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয় বড় বাধা হলো এই ইউরেনিয়াম জব্দ করার জন্য ইরানের ভূখণ্ডে সেনাবহিনী প্রবেশ করানো। আর যুদ্ধের মাঝে অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা।
অ্যাক্সিওস বলছে, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্র আলাদা চালাবে নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হবে তা এখনও ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে উভয় দেশ যখন নিশ্চিত হবে যে, ইরানের সামরিক বাহিনী আর কোনো বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না, তখনই এই অভিযান চালানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কি নিরাপদ করা হবে? তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ না করে জানান, ‘কাউকে না কাউকে গিয়ে এটা নিয়ে আসতে হবে।’
ইসরায়েলের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ট্রাম্প ও তার দল ইরানে নির্দিষ্ট কোনও অভিযানের জন্য স্পেশাল অপারেশন ইউনিট বা বিশেষ অভিযান বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।’ তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন দুটি বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তা হলো- ইরান থেকে ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া, অথবা পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের সেখানে নিয়ে গিয়ে মজুদ স্থলেই তা লঘু বা কম সমৃদ্ধ করে ফেলা।
ধারণা করা হচ্ছে, এই অভিযানে বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে বিজ্ঞানীদেরও রাখা হবে। খুব সম্ভবত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সদস্যদের রাখা হতে পারে। এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই ট্রাম্পের কাছে সম্ভাব্য যেসব পরিকল্পনার তালিকা উপস্থাপন উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার মধ্যে এই ধরনের অভিযান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শুক্রবার (৬ মার্চ) এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ট্রাম্প নির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্যে ইরানে ক্ষুদ্র পরিসরে মার্কিন সেনা মোতায়েন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে ইরানে সম্ভাব্য এই অভিযানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তার প্রশ্ন হলো, ‘ইউরেনিয়ামগুলো কোথায়? কীভাবে আমরা সেখানে পৌঁছাব এবং তা দখল করব?’
তিনি বলেন, ‘এরপরই মূলত সিদ্ধান্ত হবে প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং সিআইএ (সিআইএ) সেটিকে কি স্থানান্তর করবে নাকি ওখানেই লঘু করবে।’
শনিবার (৭ মার্চ) এয়ার ফোরস ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘স্থলসেনা পাঠানো সম্ভব—তবে তা কেবল খুব ভালো কোনো কারণ থাকলে। আমরা যদি কখনও এমনটা করি, তবে তারা (ইরানিরা) এতটাই বিধ্বস্ত হবে যে, আর স্থলপথে লড়াই করার অবস্থায় থাকবে না।’
নির্দিষ্টভাবে পারমাণবিক উপাদানগুলো সুরক্ষিত করতে সেনা পাঠানো হবে কি না—এমন প্রশ্নও ট্রাম্প উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, ‘কোনও এক সময়ে হয়তো আমরা তা করব। তবে এখনও এই বিষয়ে ভাবিনি। এখনই এই অভিযান পরিচালনা করছি না। হয়তো পরে করব।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, ‘ট্রাম্প বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের সব বিকল্প খোলা রেখেছেন এবং কোনো কিছুই নাকচ করছেন না।’
খার্গ দ্বীপ দখল নিয়েও ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইউরেনিয়াম ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য দায়ী কৌশলগত টার্মিনাল ‘খার্গ দ্বীপ’দখলের বিষয়েও ভাবছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অ্যাক্সিওসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের মতে, ওই হামলার পর থেকে ইরানিরা নিজেরাও সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।
টানা ১২ দিন ধরে চলা ওই হামলায় ইরানের প্রায় সব সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আবার শুরু হওয়ার কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কর্মকর্তারা বলছেন, মজুতের বেশিরভাগ অংশই ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ টানেলে রয়েছে, আর বাকি অংশ ফোরদো ও নাতানজ-এ বিভক্ত। যুদ্ধের শুরুর দিকেই নাতানজ ও ইসফাহানে হামলা চালানো হয়েছিল মূলত প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য, যাতে কোনও উপাদান বাইরে সরানো না যায়।
সার্বিক তথ্য অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামের মালিক, যাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছে। কারণ এটিকে অস্ত্র-গ্রেডে নিতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। যদি পুরো মজুত ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় পৌঁছায়, তবে তা ১১টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ট্রাম্পের কাছে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ (সরাসরি সেনা মোতায়েন) মানে মিডিয়া যা বোঝে তা নয়।’ অন্য একটি সূত্রের মতে, এই অভিযান হবে ছোট পরিসরে, বড় কোনও বাহিনী প্রবেশ করিয়ে নয়। তৃতীয় আরেকটি সূত্র জানায়, ইরাক যুদ্ধের (ফালুজার যুদ্ধ) সময় যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো বিশাল মার্কিন বাহিনীর মতো বড় কোনও যুদ্ধের কথা এখানে ভাবা হচ্ছে না।