logo
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল

জীবন্ত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি আবিষ্কার ও স্বীকৃতি

এএফপি
এএফপি
জীবন্ত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি আবিষ্কার ও স্বীকৃতি
স্টকহোমে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করছে নোবেল কমিটি। ছবি: এএফপি

জীবন্ত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা আলোর মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের বৈপ্লবিক প্রযুক্তি অপটোজেনেটিক্স আবিষ্কারের জন্য এ বছর ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী।

সুইডেনের স্টকহোমে নোবেল কমিটি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কার্ল ডাইসেরথ, জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার হেগেম্যান এবং ভুর্ৎসবুর্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গেয়র্গ নাগেলের নাম পুরস্কারের জন্য ঘোষণা করে।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পার সভেনিংসন বলেন, অপটোজেনেটিক্স এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে এমনভাবে মানচিত্রায়িত করা সম্ভব হয়েছে, যা একসময় বিজ্ঞানীদের কাছে কেবল কল্পনাই ছিল।

মস্তিষ্ক গবেষণায় নতুন দিগন্ত

দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অনুভূতি, আচরণ ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের পেছনে মস্তিষ্কের কোন অংশ কীভাবে কাজ করে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য ছিল। বিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা এবং মস্তিষ্কের ক্ষত পর্যবেক্ষণের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকেরা বিভিন্ন মস্তিষ্ক অঞ্চলের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে এসব পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কোনো স্নায়ুকোষের সঙ্গে আচরণের সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নির্ধারণ করা কঠিন ছিল। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্রম সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

শৈবাল থেকে এলো ‘আলোর সুইচ’

অপটোজেনেটিক্সের ভিত্তি তৈরি হয় মানুষের মস্তিষ্কে নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র এককোষী সবুজ শৈবাল ক্ল্যামাইডোমোনাস নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে।

পিটার হেগেমান গবেষণা করতে গিয়ে জানতে চান, চোখ বা স্নায়ুতন্ত্র না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই শৈবাল আলোর উৎস শনাক্ত করে তার দিকে সাঁতার কাটে। ১৯৯২ সালে তিনি শৈবালের আলোক-সংবেদনশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটে গবেষণার সময় হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল শৈবালের মধ্যে চ্যানেলরোডোপসিন নামের একটি বিশেষ প্রোটিন শনাক্ত করেন। নীল আলো পড়লে এই প্রোটিনের ভেতরে একটি চ্যানেল খুলে যায় এবং ধনাত্মক আয়ন কোষে প্রবেশ করে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। গবেষণায় দেখা যায়, অন্য কোষেও এই প্রোটিনের জিন প্রবেশ করানো হলে সেগুলোকে আলো দিয়ে সক্রিয় করা সম্ভব।

ইঁদুরের মস্তিষ্কে সফল প্রয়োগ

২০০৫ সালে কার্ল ডাইসেরথ ও তাঁর সহকর্মীরা শৈবাল থেকে পাওয়া এই আলোক-সংবেদনশীল জিন ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করাতে সক্ষম হন। ফলে নীল আলো প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে স্নায়ুকোষ সক্রিয় হয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে।

এরপর ২০০৭ সালে ডাইসেরথ ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির সহায়তায় জীবন্ত ও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা ইঁদুরের মস্তিষ্কে এই আলোকনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা কার্যকর করে দেখান। এর ফলে জীবন্ত প্রাণীর নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় সম্ভাবনা

অপটোজেনেটিক্স এখন স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রযুক্তি। এর সাহায্যে গবেষকেরা বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট নিউরাল সার্কিট শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

পার্কিনসন্স, আলঝেইমার্স, বিষণ্নতা ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল রোগের কার্যপ্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের ২০০০ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সেখানেই বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি হাওয়ার্ড হিউজ মেড চোখের কোষকে পুনরায় আলো-সংবেদনশীল করে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা চলছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আলো ও জিন প্রকৌশলের এই সমন্বয় মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছে।

তিন নোবেলজয়ীর পরিচয়

কার্ল ডাইসেরথ ১৯৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সেখানেই বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি হাওয়ার্ড হিউজ মেডিকেল ইনস্টিটিউটের সঙ্গেও যুক্ত।

পিটার হেগেমান ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োকেমিস্ট্রি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি বার্লিনের হামবোল্ট ইউনিভার্সিটিতে স্নায়ুবিজ্ঞানের সিনিয়র অধ্যাপক।

গেয়র্গ নাগেল ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ভুর্ৎসবুর্গ ইউনিভার্সিটির মলিকুলার প্ল্যান্ট ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার একটি বড় অংশ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিক্সে সম্পন্ন হয়।