logo

ইউক্রেনে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে রাশিয়ার হামলা, নিহত ২৬

ইউক্রেনে ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে রাশিয়ার হামলা, নিহত ২৬
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় মানবিক সহায়তা বিতরণের একটি স্কুলে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় মানবিক সহায়তা বিতরণের একটি স্কুলে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী ও চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার (২ নভেম্বর) এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

ইউক্রেনের দাবি, খেরসন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ হামলা চালায় রাশিয়া। গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া ওই যুদ্ধবিরতি রোববার শেষ হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেন, কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি চলাকালে কোনো লঙ্ঘনের অভিযোগ করেনি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, জাপোরিঝঝিয়ার একটি গ্রামের স্কুলে প্রতি সোমবার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। হামলার দিনও সহায়তা নিতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ।

জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ সেখানে পৌঁছানোর পরপরই রাশিয়া কয়েকটি বিমানবোমা নিক্ষেপ করে। পরে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়, যার লক্ষ্য ছিল আশ্রয়কেন্দ্রটি।

আঞ্চলিক ভারপ্রাপ্ত গভর্নর মিখাইলো সেমিকিন টেলিগ্রামে জানান, নিহতদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী এবং চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ নিহত উদ্ধারকর্মীদের ডেনিস কোনোভালেঙ্কো ও ওলেক্সি সুশচেভস্কি হিসেবে শনাক্ত করেছে। তাদের দুজনেরই বয়স ছিল ৪৪ বছর।

জরুরি সেবা বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রতিদিন মানুষের সহায়তায় কাজ করতেন ওই উদ্ধারকর্মীরা।

হামলার পর ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগের প্রকাশ করা ভিডিওতে স্কুল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখা যায়। সেখানে উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালাতেও দেখা গেছে।

জেলেনস্কি বলেন, ওলেশকিতে মানবিক অভিযান শেষে এমন একটি সময় এসেছিল, যখন পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে শান্তির পথে অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড তার বিপরীত বার্তা দিচ্ছে।

যুদ্ধবিরতি ও ওলেশকি থেকে উদ্ধার অভিযান

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে মানবিক উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় স্থানীয় যুদ্ধবিরতিটি কার্যকর হয়েছিল। মঙ্গলবার শুরু হয়ে রোববার শেষ হওয়া এই বিরতি ছিল ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘতম যুদ্ধবিরতি।

এই যুদ্ধবিরতির আওতায় ওলেশকি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের কেউ ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এবং কেউ রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিমিয়ায় আশ্রয় নেন।

ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোববার এএফপিকে জানান, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল কিয়েভ, তবে মস্কো তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির সুযোগে নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে রাশিয়া।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চর্চা। তার দাবি, অতীতেও ইউক্রেনীয় বাহিনী যুদ্ধবিরতির সময় নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ নিয়েছে।

পেসকভ ওলেশকির মানবিক অভিযানকে সফল উল্লেখ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে ভালো সহযোগিতা ছিল। এ অভিযানে রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লান্ত্রাতোভা এবং ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে আপাতত এ ধরনের আর কোনো মানবিক অভিযান আয়োজনের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।

আবুধাবিতে ফের আলোচনায় বসছে রাশিয়া-ইউক্রেন

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি আলোচনা আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, ট্রাম্প ক্রমেই মস্কোর অবস্থানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছেন।

দুই দেশের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে সাইবার হামলা

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়া ও ইউক্রেন; উভয় দেশই জানিয়েছে, তাদের জরুরি সতর্কতাসংক্রান্ত মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলা হয়েছে।

ইউক্রেনের অভিযোগ, দেশটির বিমান হামলার সতর্কতা ব্যবস্থা হ্যাক করা হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষের কাছে তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত হামলার ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে ইউক্রেনের এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের একটি অ্যাপও হ্যাক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মস্কো। তবে দেশটিতে অ্যাপটির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার সতর্কতা সাধারণত মোবাইল ফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে নতুন করে এই হামলা ও সাইবার আক্রমণের ঘটনা শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।