ইরাকে তীব্র অর্থসংকট, বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছে সরকার

সম্প্রতি বাগদাদে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তাদের এক সভায় ইরাকের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবদুল হুসেন আল-মুসাউইয়ের ‘টাকা নেই’ মন্তব্যটি দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকের কাছে এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সংকটের একপ্রকার আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি বলেই মনে হয়েছে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তীব্র তারল্য সংকটের কারণে সরকার এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে। রাষ্ট্রের মৌলিক ব্যয় নির্বাহেও সরকার হিমশিম খাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি মাসে বেতন ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটাতে সরকারের প্রয়োজন প্রায় ১০ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইরাকি দিনার (৮.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
দেশটির কোনো মন্ত্রী এর আগে এভাবে প্রকাশ্যে সংকটের কথা আগে বলেননি। একক সম্পদনির্ভর দেশটিতে এই সংকট দেখা দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ইরাকের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের কথাবার্তায়ও স্পষ্ট। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকারি কর্মচারী আমিরা আলী আলজাজিরাকে বলেন, বেতন বিলম্বিত হওয়ায় বহু পরিবার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
সরকারের একটি সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সমাজকল্যাণভোগীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রয়োজন ৭.৮ ট্রিলিয়ন দিনার (৬ বিলিয়ন ডলার)। অথচ চলতি মাসের বেতন পরিশোধে এখনও ৩.২ ট্রিলিয়ন দিনার (২.৪ বিলিয়ন ডলার) ঘাটতি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, মে ও জুন মাসে সরকারের মাসিক রাজস্ব ৩ ট্রিলিয়ন দিনার (২.৩ বিলিয়ন ডলার) অতিক্রম করেনি, যা কেবল বেতন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।
প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সরকার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খায়। তেল রপ্তানি কমে যাওয়ায় রাজস্বে বড় ঘাটতি তৈরি হয়।
সরকারের মুখপাত্র হায়দার আল-আবৌদি জানিয়েছেন, হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হলে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণ নিতে বাধ্য হতে পারে। বিদ্যুৎ বিল আদায়ের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। ফলে সম্ভাব্য রাজস্বের ৮৬ শতাংশই আদায় হচ্ছে না।
সরকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বরাদ্দ ১২ ট্রিলিয়ন দিনার থেকে ৭ ট্রিলিয়ন দিনারে নামিয়ে আনার বিষয় বিবেচনা করছে। এতে খাদ্য রেশন কার্ডে পণ্যের সংখ্যা কমবে। শিশুদের তিন বছর বয়সের আগে রেশন কার্ডে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়ও বিবেচনাধীন রয়েছে। এসব পদক্ষেপে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ বিলিয়ন দিনার সাশ্রয় হবে বলে সরকার আশাবাদী।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরাকের বর্তমান সংকট কেবল তারল্যের সংকট নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল।
তাদের মতে, তেল রপ্তানি কমলেই বেতন, সরকারি সেবা ও উন্নয়ন ব্যয় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত সামাজিক সংকটে রূপ নেয়। বিকল্প আয়ের টেকসই উৎস গড়ে না তুললে জ্বালানি বাজার বা রপ্তানি পথে যেকোনো অস্থিরতা ভবিষ্যতেও ইরাকের সরকারি অর্থব্যবস্থাকে একই ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
