গাজায় ইসরায়েলি বোমার তাপে ‘গলে গেছে’ অন্তত ২৮৪২ ফিলিস্তিনি

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনি এমনভাবে নিখোঁজ হয়েছেন যে, তাদের দেহাবশেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আলজাজিরা আরবির ‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’ নামের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে এসব নিহতের ঘটনায় থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে। এসব অস্ত্র মানবদেহকে মুহূর্তেই ছাইয়ে পরিণত করতে পারে।
প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সংস্থাটির দাবি, এটি কোনো অনুমান নয়; বরং ঘটনাস্থলে ফরেনসিক যাচাইয়ের মাধ্যমে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে এমনটি হয়েছে। এগুলোকে অনেক সময় ভ্যাকুয়াম ও অ্যারোসেল বোমা হিসেবে ডাকা হয়। এসব বোমা ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উৎপন্ন করে, যা একটি মানুষকে সহজেই গলিয়ে দিতে পারে।
এমন ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় গাজার ইয়াসমিন মাহানির মুখে। তিনি ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলে হামলার পর ধ্বংসস্তূপে ছেলেকে খুঁজছিলেন।
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, মসজিদের ভেতরে ঢুকে দেখলাম মাংস আর রক্তের ওপর দিয়ে হাঁটছি। এরপর কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল আর মর্গে খোঁজ করেও ছেলে সাদের কোনো সন্ধান পাইনি। দাফন করার মতো লাশের টুকরোও পাইনি।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাাজর বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, হামলার পর এসব মানুষ খুঁজতে তারা ‘এলিমিনেশন পদ্ধতি’ অনুসরণ করেন।
তিনি বলেন, যদি কোনো পরিবার জানায় তারা ঘরে পাঁচজন ছিলেন, আর আমরা তিনটি অক্ষত লাশ পাই, তখন দীর্ঘ অনুসন্ধানে শুধু রক্তের ছাপ বা ছোট মাংসের টুকরো ছাড়া কিছু না পেলে তবেই বাকি দুজনকে ‘গায়েব হয়ে গেছে’ হিসেবে ধরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, থার্মোবারিক বা উচ্চ তাপ সৃষ্টিকারী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। রুশ সামরিক বিশ্লেষক ভাসিলি ফাতিগারভ বলেন, থার্মোবারিক অস্ত্র শুধু মেরেই ফেলে না, বরং এটা নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। এগুলো প্রচলিত বোমা বিস্ফোরণের মতো নয়। এই অস্ত্র জ্বালানি মেঘ তৈরি করে বিশাল আগুনের গোলা ও চাপ সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও টাইটানিয়ামের রাসায়নিক সংমিশ্রণ ব্যবহৃত হয়। এর ফলে বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা বেড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের একটি বোমা হলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪। যাতে ব্যবহৃত ট্রিটোনাল (টিএনটি ও অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়ার মিশ্রণ) তীব্র তাপ তৈরি করে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মুনির আল-বুরশ বলেন, মানবদেহ প্রায় ৮০ শতাংশ পানি দিয়ে গঠিত। আর পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যখন একটি মানবদেহ ৩ হাজার ডিগ্রির বেশি তাপ, তীব্র চাপ ও অক্সিডেশনের (জারণ) মুখে পড়ে; তখন শরীরের তরল পদার্থ তাৎক্ষণিকভাবে ফুটে ওঠে এবং দেহের টিস্যু পুড়ে ছাইয়ে পরিণত হয়।
অনুসন্ধানে গাজায় ব্যবহৃত এমন কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অস্ত্রের নাম সামনে এসেছে। এগুলো হলো—
এমকে-৮৪ ‘হ্যামার’: ৯০০ কেজি ওজনের এই বোমা সাড়ে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ উৎপাদন করতে পারে।
বিএলইউ-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েল ঘোষিত ‘নিরাপদ এলাকায়’ এই বোমা ফেলা হয়। এতে সেখানে ২২ জন নিহত হন। শক্ত ইস্পাতের আবরণ ও ফিউজসহ এ বোমায় পিবিএক্সএন-১০৯ বিস্ফোরক থাকে, যা মাটির ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হওয়ার আগে আগুনের গোলা তৈরি করে ওই স্থানের সবকিছু পুড়িয়ে ফেলে।
জিবিইউ-৩৯: আল-তাবিন স্কুলে হামলায় ব্যবহৃত নির্ভুল গ্লাইড বোমা। এতে এএফএক্স-৭৫৭ বিস্ফোরক থাকে। এই বোমা ভবনের কাঠামো তুলনামূলক অক্ষত রেখে ভেতরের সবকিছু ধ্বংস করার জন্য বিশেষভাবে নকশা করা। এই বোমা প্রচণ্ড চাপ তরঙ্গের মাধ্যমে ফুসফুস ছিঁড়ে ফেলে এবং অত্যাধিক তাপের মাধ্যমে শরীরের নরম অংশ পুড়িয়ে দেয়।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, যেসব স্থানে হামলার পর দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি, সেখানে জিবিইউ-৩৯-এর ডানার টুকরো মিলেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে এই নির্বিচার অস্ত্রের ব্যবহার কেবল ইসরায়েলকেই নয়; বরং এর পশ্চিমা সরবরাহকারীদেরও জড়িত করে।
আইনজীবী ডায়ানা বুট্টু বলেন, নির্বিচারে ব্যবহৃত এ ধরনের অস্ত্র আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর অপরাধের শামিল। আমরা দেখছি এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আসছে। তারা জানে এসব অস্ত্র যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তবুও তারা সেগুলো পাঠাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলকে সম্ভাব্য গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে নির্দেশ দেয়। নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে সংঘাত ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ তারিক শানদাবের ভাষায়, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার জন্য গাজা একটি কঠিন পরীক্ষা ছিল। যেখানে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা হেরে গেছে।
তিনি অবরোধ ও মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আইনি বিতর্কের বাইরে, যুদ্ধের মানবিক মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা রফিক বদরান এই যুদ্ধে চার সন্তান হারিয়েছেন। তিনি দাফনের জন্য কেবল চার সন্তানের দেহের অল্প কিছু টুকরা পেয়েছিলেন।
চোখের জল সামলে তিনি বলেন, ‘আমার চার সন্তানই যেন বাতাসে মিশে গেল। লাখো বার তাদের খুঁজেছি। কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, তারা কোথায় হারিয়ে গেল?’