logo

পারমাণবিক বোমা তৈরির মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার হুমকি ইরানের

পারমাণবিক বোমা তৈরির মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার হুমকি ইরানের
ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে যুদ্ধংহেদী মনোভাব নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিতে অগ্রসর হচ্ছে; তাদের সামরিক বাহিনী মোতায়েন ও শক্তি সঞ্চয় করে যাচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে এবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। তারা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে আবারও আক্রমণ চালায়, তাহলে পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইউরেনিয়ামের মজুত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার হুমকি দিয়েছে ইরান।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্য এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই হুমকি দেন ইরানের পার্লামেন্ট কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই

তিনি পোস্টে বলেন, ‘আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটলে ইরানের হাতে থাকা অন্যতম বিকল্প হতে পারে ৯০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ।’

তার এই হুমকি এমন এক সময় এলো, যখন গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হচ্ছে যে, দেশটির সঙ্গে আলোচনা অচলাবস্থায় থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন।

ট্রাম্পের আপত্তি

ট্রাম্প তেহরানের ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে তার পরিকল্পিত যুদ্ধের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ইরানের ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’-এর কথা উল্লেখ করেছেন, যা এখন ৭০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্ত্রের মজুতের ওপর ‘ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে’। কেউ ওই স্থানের কাছাকাছি এলে ওয়াশিংটন তা জানতে পারবে এবং ‘তাদের উড়িয়ে দেওয়া হবে’।

সোমবার ট্রাম্পও সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। এর আগে তিনি ইরানের সর্বশেষ পাল্টা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাদের সামরিক বাহিনী যে কোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা প্রস্তাবে তাদের কিছু উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে ফেলার এবং বাকি অংশ কিছু সময়ের জন্য একটি তৃতীয় দেশে স্থানান্তর করার সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, গত আট বছরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর, ইরান ২২ হাজার পাউন্ড বা ১১ হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করেছে।

২০০৬ সালে শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে ইরান। তাদের দাবি, এই সমৃদ্ধকরণের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণ।

জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে এর মজুত বেড়েই চলেছে। ২০১০ সালে তেহরান ঘোষণা করে যে, তারা ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করবে। এর উদ্দেশ্য আপাতত একটি গবেষণা চুল্লির জন্য জ্বালানি তৈরি।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থাটি মনে করে যে, ইরানের মজুত থাকা ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি (৯৭২ পাউন্ড) ইউরেনিয়ামকে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতা পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে, যা ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার অস্ত্র-গ্রেড স্তর থেকে একটি স্বল্পমেয়াদী ও প্রযুক্তিগত ধাপ।

ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ ক্রমশ সহজ হয়ে ওঠে। পারমাণবিক কর্মসূচিতে শূন্য থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানোই সবচেয়ে কঠিন ধাপ। এরপর ২০ শতাংশ থেকে ৬০ বা ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ, আর ৯০ শতাংশ মাত্রাকেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী ধরা হয়।

২০২১ সালের জুন মাসে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি স্বীকার করেছিলেন যে, প্রয়োজন হলে তেহরান তার পারমাণবিক চুল্লিগুলোর জন্য ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে। তবে তিনি এও যোগ করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে দেশটি ২০১৫ সালের সেই চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, যা তাদের পারমাণবিক কার্যক্রমকে সীমিত করবে।

আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুহানি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বলেছেন, ‘ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা ২০ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে। যদি কোনোদিন আমাদের চুল্লির প্রয়োজন হয়, তবে এটি ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতা পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।’

ইরানের ইউরেনিয়াম কোথায়?

কিন্তু ইরানের মজুতের কাহিনী এখনও রহস্যই থেকে গেছে। আইএইএ মনে করে, ইরানের সিংহভাগ ইউরেনিয়াম সম্ভবত এখনও দেশটির ইস্ফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রেই রয়েছে। এই কেন্দ্রটি গত বছরের জুন মাসে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং চলতি বছরের মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাতেও আক্রমণের শিকার হয়েছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেন, এই পারমাণবিক নজরদারি সংস্থাটি বিশ্বাস করে যে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ ‘২০২৫ সালের জুন মাসে যখন ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়, তখন সেখানেই মজুত করা হয়েছিল এবং তখন থেকেই তা সেখানে রয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘উপাদানটি এখনও সেখানে আছে কি না এবং আইএইএ'র সিলগুলো অক্ষত রয়েছে কি না, তা আমরা এখনো যাচাই বা নিশ্চিত করতে পারিনি। তবে আমরা আশা করছি, শিগগিরই তা পরীক্ষা করতে পারব। তাই আমি এখন যা বলছি, সেটাই আমাদের কাছে থাকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধারণা।’