গাজায় খাবারের বিনিময়ে কিশোরীদের বিয়ে দিচ্ছে পরিবার

ইসরায়েলি তাণ্ডবে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও তীব্র দুর্ভিক্ষের গ্রাসে গাজায় শতবছরের মানবিক সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। অনাহার, চরম দারিদ্র্য আর নিরাপত্তার হাহাকারে ভেসে যাওয়া বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে জন্ম নিয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। সামান্য একমুঠো খাবারের বিনিময়ে কনের পণ হিসেবে তুলে দেওয়া হচ্ছে কিশোরী মেয়েদের। বেঁচে থাকার এই আকুল আকুতিতে গাজাজুড়ে বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিয়ে এখন এক বুকভাঙা মহামারির রূপ নিয়েছে।
ফিলিস্তিনের এই উপত্যকায় জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহের শিকার নারী ও মেয়েদের চরম বিপন্নতার এই শিউরে ওঠার মতো ঘটনা উঠে এসেছে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদনে। এমনকি ধর্ষণের শিকার নারীদের সামাজিক কলঙ্ক এড়াতে ধর্ষণকদের সঙ্গেও বিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন পর্যন্ত জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহের নথিভুক্ত ঘটনা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি এ প্রবণতাকে তীব্র অবনতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র ক্ষুধা, দারিদ্র্য, আয়হীনতা ও স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে পরিবারগুলো টিকে থাকার জন্য চরম চাপের মুখে পড়েছে। ১০টি সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য এবং গাজা সিটি ও খান ইউনিসের বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাসকারী ২৩০ নারীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
খান ইউনিসে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক নারী জানান, ২০২৫ সালের ‘দুর্ভিক্ষের সময় এক ব্যক্তি তার ১৪ বছর বয়সি মেয়েকে দুই বস্তা আটার বিনিময়ে বিয়ে দিয়ে দেন’। এতে তিনি নিজের ও অন্য সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন বাস্তুচ্যুত শিবিরে সাক্ষাৎকার দেওয়া আরও ছয় নারী একই ধরনের বিনিময়ের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, যুদ্ধের আগে এ ধরনের ঘটনা কল্পনাও করা যেত না।
ইউএনএফপিএর সংগৃহীত তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুনে গাজায় বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহের মতো সহিংসতার ঘটনা জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরীরাই মূলত এই জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।
যুদ্ধে বাবা-মা হারানো মেয়েরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজা সিটির একটি শিবিরে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক নারী জানান, তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সি দুই মেয়েকে বাবা-মা নিহত হওয়ার পর তাদের চাচারা বিয়ে দিয়ে দেন। কোথাও কোথাও একমুঠো খাদ্য, সামান্য খাবার বা মাথার ওপর একটা তাঁবুর বিনিময়েও বিধবা ও অনাথ নারীদের যৌন শোষণ ও জোরপূর্বক বিয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া গাজা শহরের একটি শিবিরের এক নারী জানান, তিনি তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সি দুই মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। ওই নারী বলেন, ‘তাদের চাচারা খুব অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। জানেন কেন? কারণ তাদের বাবা-মা শহীদ হয়েছিলেন। আর তাদের চাচারা দায়িত্ব ও খরচ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, বিয়ে বা জীবন কী, তা ওরা বোঝেই না।’
জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ মানবিক সংস্থা ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়েকে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করে। যুদ্ধের আগেও অধিকৃত পশ্চিম তীরের তুলনায় হামাস-শাসিত গাজায় বাল্যবিবাহ বেশি প্রচলিত ছিল। তবে তখন এর হার কম।
গাজার আইনে বাবা-মায়ের সম্মতি ও বিচারকের অনুমোদন সাপেক্ষে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৭ বছর। তবে এর ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। আদালতের কর্মকর্তারা ১৪ বছর ৭ মাস বয়সি মেয়েদেরও বিয়ের অনুমোদন দিতে পারেন। স্থানীয় এক শরিয়া বিশেষজ্ঞ জানান, যুদ্ধের বড় একটি সময় মুসলিমদের পারিবারিক বিষয়াদি পরিচালনাকারী ইসলামি আদালতগুলো বন্ধ থাকায় এই ‘আইনি সুরক্ষা’ও কার্যত উঠে যায়।
বিবিসি এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যেখানে শোকাহত আত্মীয়দের বিয়ে হয়েছে। ২৫ বছর বয়সি জুহায়ের জানান, ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক মেয়ের বাবা নিহত হওয়ার পর তার চাচারা তাকে তাদের দূরসম্পর্কের ১৬ বছর বয়সি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চাপ দেন। মেয়েটির বাবা ছিলেন তার একমাত্র অভিভাবক। কেন তিনি এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন জানতে চাইলে জুহায়ের বলেন, ‘আমি তাকে বিয়ে করার অন্যতম কারণ ছিল, তার দেখাশোনা করার মতো আর কেউ ছিল না। এটাই প্রথম কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ না হলে, সে এখনও তার বাবার আদরে থাকা এক ছোট্ট মেয়েই থাকত। সে স্কুলে যেত। তার মানসিকতা এখনও শিশুর মতো, পরিণত নয়। সে স্কুল, পরিবার ও বন্ধুদের খুব মিস করে। এমনকি শুধু বাড়িতে বসে থাকাও তার কাছে অসহ্য লাগে।’
এক দম্পতি জানান, তাদের বড় ছেলে ও মেয়েটির বাবা নিহত হওয়ার পর তারা তাদের ১৭ বছর বয়সি ছেলেকে তার ১৬ বছর বয়সি চাচাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেন। কিশোরীটি এখন অন্তঃসত্ত্বা। ফলে সে আর স্কুলে ফিরতে পারবে না। তার শ্বশুর বলেন, ‘তাকে তার সন্তানের যত্ন নিতে হবে, তা না হলে তার পড়াশোনা বৃথা যাবে।’
কলঙ্ক ও প্রতিশোধের ভয়ের কারণে গাজায় যৌন সহিংসতার অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা নিরীক্ষায় দেখা গেছে, রাতে নারী ও মেয়েরা বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়েন। এ কারণে তারা শিবিরের শৌচাগারও এড়িয়ে চলেন।
ইউএনএফপিএর নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের সর্বশেষ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ যৌন সহিংসতার ঘটনা ‘মারাত্মক আকার ধারণ করেছে’। গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত নথিভুক্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মোট ঘটনার ২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল এ ধরনের ঘটনা। আগের ত্রৈমাসিকে এই হার ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ। এতে মোট ঘটনার সংখ্যা ৬১ শতাংশ বেড়েছে।
এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও গোপনীয়ভাবে অভিযোগ জানানোর উন্নত ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টাকে দায়ী করা হচ্ছে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই ছিলেন ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সি নারী। এরপর ছিলেন ৮ শতাংশ কিশোরী ও ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। বিধবা অথবা যাদের স্বামী আটক বা নিখোঁজ, এমন নারীরা যৌন নির্যাতন ও শোষণের বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি চারটি পরিবারের একটির প্রধান নারী। যুদ্ধের আগের তুলনায় এই অনুপাত দ্বিগুণ।
ইউএনএফপিএর প্রতিবেদনের জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজা শহরের এক নারী একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এক বিধবা একটি তাঁবু খুঁজছিলেন। (শিবিরের) একজন প্রতিনিধি তাকে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে একটি তাঁবু দেব, আমরা আপনাকে আমাদের শিবিরে রাখব, এবং আপনি আজ রাতে আমার সঙ্গে এসে থাকতে পারেন।’
ফিলিস্তিনে ইউএনএফপিএর শীর্ষ প্রতিনিধি নেস্তর ওমোহাঙ্গি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ধ্বংসযজ্ঞ, টানা বাস্তুচ্যুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থা, ইসলামি পারিবারিক আদালত বন্ধ থাকায় গাজাবাসীর সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে চরম ক্ষুধা ও অপুষ্টির মধ্যে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এতে মা ও অপুষ্টিতে ভোগা নবজাতকদের মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।


