মমতা নয়, যত আপত্তি অভিষেকে!

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ ঘটা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ছিল ঘাসফুল। এরপর গত কয়েক বছরে তার হাত ধরেই তৃণমূল কংগ্রেস মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। গত ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায়ও ছিল দলটি।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হারের মাস পেরোতেই ‘ঘাসফুল’ যেন শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থায়। একের পর এক কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান, পঞ্চায়েত সদস্য পদত্যাগ করেছেন।
প্রকাশ্যে চলে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষোভ। তৃণমূল ভেঙেই আর একটা তৃণমূল গঠন হয়েছে। দলনেত্রী মমতার পছন্দকে অমান্য করে বিধানসভায় নতুন বিরোধী দলনেতা হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
তার হাত ধরে নতুন তৃণমূলের উৎপত্তি, আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই পরামর্শদাতা হিসেবে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো দলের এই অবস্থার জন্য দায়ী কে, মমতা নাকি তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?
বিদ্রোহী নেতাদের অধিকাংশই দাবি, মমতার হাতে গড়া দল এখন তার নিয়ন্ত্রণে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মমতার হাত থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে অভিষেকের হাতে। এরপরই জনতার দল থেকে পরিণত হয়েছে করপোরেট দলে।
বিশেষ করে নির্বাচনি পরামর্শক সংস্থা ‘আইপ্যাক’কে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আহ্বান করে নিয়ে এসে দরের বেহাল দশা করেছেন। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে মানলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তারা নেতা হিসেবে মানতে নারাজ।
অভিষেককে উদ্দেশ করে মালদার তৃণমূল নেতা ও সাবেক মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলেছেন, আজ বড় দুঃখ লাগছে। তিল তিল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়ে তোলা দলটাকে শেষ করে দিল অভিষেক।
তার অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলে আসার পর থেকেই তৃণমূলের জনমুখী চরিত্র বদলে গেছে। পুরোনো কর্মীদের কোণঠাসা করে দলে এক নতুন সংস্কৃতির আমদানি করা হয়েছে। এই দলেও করপোরেট কালচার ও মাফিয়া কালচার নিয়ে এসেছে। যার ফলে দলের আদর্শ বলে কিছু নেই। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন কৃষ্ণেন্দু।
১৯৯৮ সাল থেকে তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বর্তমানে দলের বারাসাত আসনের বিধায়ক কাকলি বলেন, আমি বহুদিন দলের সঙ্গে আছি। আমি মনে করি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আবার দলের লাগাম টেনে ধরেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে উনি যেই ফল চাইছেন সেটা পাবেন।
আইপ্যাক নামক সংস্থার কারণে নির্বাচনে তৃণমূলের এই বিপর্যয় বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে দলে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, অসদাচরণ ঘটেছে, নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা অহংকার জন্মানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কাকলি ঘোষ।
বর্তমানে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘১৮তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে ৮০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তার মধ্যে আপাতত ৬০ জন বিধায়ক মনে করেছেন তারাই প্রধান বিরোধী দল।’
অনেকের মতে, ঋতব্রতের এই মন্তব্য স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, ধীরে ধীরে তৃণমূল থেকে অভিষেককে সরিয়ে ফেলাটাই তাদের উদ্দেশ্য।
তৃণমূলের ভাঙন নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক তৃণমূল বিধায়ক, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক ও চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। বৃহস্পতিবার হুমায়ুন বলেন, একটা দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হয়েও যদি অন্যদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়, তার ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মমতা আজ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। তিনি যদি ভোটে জিততেন এবং নেতৃত্ব দিতেন তবে কেউ আর মুখ খুলতেন না।
