logo

এক বছরে ‘বেপরোয়া’ ট্রাম্প

এক বছরে ‘বেপরোয়া’ ট্রাম্প

দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আজ মঙ্গলবার এক বছর পূর্ণ করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ নেন তিনি। এই এক বছরে ট্রাম্প অভূতপূর্ব নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছেন। পাশাপাশি মার্কিন বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির গতিপথেও এনেছেন বড় পরিবর্তন, যা তাকে ‘বেপরোয়া’ হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে।

তবে দ্বিতীয় বছরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের শাসনশৈলী আরও আক্রমণাত্মক ও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে।
 
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্ক

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিনেসোটায় অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ফেডারেল অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। ওই অভিযানের সময় এক ফেডারেল এজেন্টের গুলিতে একজন নিরস্ত্র নারী মোটরচালক নিহত হন, যা দেশজুড়ে সমালোচনার জন্ম দেয়।

একই সময়ে তিনি লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা নতুন করে উত্থাপন করেন, ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলার হুমকি দেন এবং ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি তদন্ত নিয়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা উড়িয়ে দেন।

গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পরোয়া করি না’। এর আগে ৭ জানুয়ারি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, বিদেশে সামরিক হামলার ক্ষেত্রে একমাত্র নজরদারি হলো ‘আমার নিজস্ব নীতি’।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য এমন একটি প্রেসিডেন্টের ধারণাকে তুলে ধরে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধিই মুখ্য।

হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ কূটনীতি এবং তিনি প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তেই নেন। তবে তিনি সব বিকল্প খোলা রাখেন। কেলির ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় সেনা পাঠানো এবং গত বছর তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সিদ্ধান্ত নেন।

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প অর্থনীতি, অভিবাসন, ফেডারেল আমলাতন্ত্র ও মার্কিন সাংস্কৃতিক জীবনের বড় অংশ ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এক বছরের মধ্যেই তিনি সেই এজেন্ডার বড় অংশ বাস্তবায়ন করেছেন, যা তাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ক্ষমতাবান মার্কিন প্রেসিডেন্টে পরিণত করেছে।

তবে দ্বিতীয় বছরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ইতিহাস অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, নভেম্বরে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।

গত সপ্তাহে রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৪১ শতাংশ, যেখানে ৫৮ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক তার কাজের পারফরম্যান্সকে সমর্থন করেননি। যদিও এই হার কম, তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন নয়।

ইউরোপ ও ন্যাটোর উদ্বেগ

কিছু ন্যাটো মিত্রের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর ইউরোপীয় নেতারা রোববার একটি জরুরি বৈঠক করেন। ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদ অ্যালেক্স ফ্লয়েড বলেন, ‘আইনের শাসন ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞা মার্কিনিদের কম নিরাপদ করে তুলছে এবং এর রাজনৈতিক মূল্য রিপাবলিকানদের দিতে হতে পারে।’

অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নির্বাচন-পূর্ব সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ইতিহাসের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’, যদিও সরকারি তথ্যে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বক্তব্য ও পদক্ষেপ নিলেও, একই সঙ্গে বিষয়টিকে ডেমোক্র্যাটিক ‘প্রতারণা’ বলায় তার বার্তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

‘১৯৩০-এর দশকের পর সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট’

প্রথম বছরে ট্রাম্প ফেডারেল কর্মী সংখ্যা কমিয়েছেন, একাধিক সরকারি সংস্থা ভেঙে বা বন্ধ করেছেন, বিদেশি মানবিক সহায়তা হ্রাস করেছেন, ব্যাপক অভিবাসন অভিযান ও নির্বাসন চালিয়েছেন এবং ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন।

তিনি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন, বড় কর ও ব্যয়-কমান আইন পাস করিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়, আইন সংস্থা ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তিনি এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারেননি, যদিও দাবি করেছেন যে, একাধিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছেন।

ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাহী আদেশ ও জরুরি ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প কংগ্রেসের বাইরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন, যা আধুনিক সময়ে বিরল। সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসও তাকে খুব একটা বাধা দেয়নি।

রাষ্ট্রপতি ইতিহাসবিদ টিমোথি নাফতালি বলেন, ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের পর ট্রাম্পই তার দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে কম সীমাবদ্ধতার মধ্যে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ যথাযথভাবে সমাধান করতে না পারলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন।

সহযোগীদের মতে, ট্রাম্প এ বছর জোরালোভাবে তার অর্থনৈতিক এজেন্ডা তুলে ধরতে দেশজুড়ে প্রচারে নামবেন। তবে সাম্প্রতিক বক্তৃতায় বার্তার অসংগতি ও বৈদেশিক বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ কিছু রিপাবলিকান কৌশলবিদকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।