logo

পাকিস্তান নাকি আফগানিস্তান, সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে?

পাকিস্তান নাকি আফগানিস্তান, সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে?

সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা ও প্রতিশোধমূলক অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছে। দুপক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ভারী ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য মিলছে, যেগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বলেন, পাকিস্তান এখন প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে। অক্টোবরে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে বড় উত্তেজনা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর তারা ডুরান্ড লাইন ধরে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার পার্থক্যও সামনে আসছে।

সামগ্রিক শক্তির হিসাবে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচকে ১৪৫ দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪তম। তাদের পাওয়ার ইনডেক্স স্কোর ০.২৬২৬। এই সূচকে স্কোর যত কম, সামরিক শক্তি তত বেশি ধরা হয়। একই তালিকায় আফগানিস্তানের অবস্থান ১২১তম, স্কোর ২.৭৩৪২।

পাকিস্তানের সামরিক অস্ত্রের মহড়া। ছবি: সংগৃহীত

লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের মতে, পাকিস্তান নিয়মিত নিয়োগ, আধুনিকায়ন এবং বিশেষ করে চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা কমেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

সৈন্যসংখ্যা

এ ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সক্রিয় সামরিক সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার সেনাবাহিনীতে, ৭০ হাজার বিমানবাহিনীতে এবং ৩০ হাজার নৌবাহিনীতে কর্মরত। এ ছাড়া প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার রিজার্ভ সদস্য ও ৫ লাখ আধাসামরিক সদস্য রয়েছে।

আফগানিস্তানের সক্রিয় সামরিক শক্তি পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের সক্রিয় সামরিক সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার। তা বাড়িয়ে ২ লাখে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে কাবুল। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার অনুযায়ী, দেশটির সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ৭৫ হাজার এবং প্যারামিলিটারির সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার।

এদিকে জনসংখ্যার হিসাবেও রয়েছে বড় পার্থক্য। পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৫ কোটির বেশি, যেখানে আফগানিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। অর্থাৎ জনবল জোগানের দিক থেকে ইসলামাবাদ স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে।

বিমান শক্তি

দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায় আকাশযুদ্ধে সক্ষমতায়। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট ১ হাজার ৩৯৭টি বিমান রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩১টি যুদ্ধবিমান, ৯০টি ডেডিকেটেড অ্যাটাক এয়ারক্রাফট, ৩৭৯টি হেলিকপ্টার এবং ৫৫টি অ্যাটাক হেলিকপ্টার।

bigStoryContent
আফগানিস্তানে সেনাবাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে আফগানিস্তানের কোনো কার্যকর যুদ্ধবিমান নেই। ধারণা করা হয়, তাদের কাছে অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে। বেশিরভাগই সোভিয়েত আমলের এবং সেগুলোর কার্যক্ষমতা স্পষ্ট নয়। এই আকাশ-শক্তির ব্যবধান সীমান্তবর্তী অভিযানে পাকিস্তানকে বড় সুবিধা দেয়।

স্থলবাহিনী

স্থলযুদ্ধের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান এগিয়ে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে ২ হাজার ৬৭৭টি ট্যাঙ্ক, ৫৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান, ৬৬২টি স্বচালিত আর্টিলারি ইউনিট, ২ হাজার ৬২৯টি টানা কামান এবং ৬৫২টি মোবাইল রকেট প্রজেক্টর রয়েছে।

আফগানিস্তানের সাঁজোয়া যান রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০২টি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হাতে সোভিয়েত আমলের কিছু ট্যাংক ও কামান থাকলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা স্পষ্ট নয়। তবে আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালেবান সরকারের সামরিক বহরে কোনো কমব্যাট ট্যাংক নেই।

ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা

মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালাইন্সের তথ্য অনুযায়ী, তালেবানরা পূর্বতন বাহিনী থেকে কিছু ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম (ম্যানপ্যাডস) পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ফিম-৯২ স্ট্রিংগার (পরিসর প্রায় ৮ কিলোমিটার) এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাওয়া এসএ-২৪ ইগলা-এস (পরিসর প্রায় ৬ কিলোমিটার)।

২০২১ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর তালেবানরা সোভিয়েত আমলের কিছু ভারী অস্ত্রভান্ডার খুঁজে পায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ছিল স্কাড-বি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, এবং এফআরওজি-৭ বা ফ্রগ-৭ আর্টিলারি রকেট, যার পাল্লা প্রায় ৬৮ কিলোমিটার। তবে এসব অস্ত্র কতটা সচল বা কার্যক্ষম, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত।

অন্যদিকে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অনেক বেশি উন্নত ও সুসংগঠিত। তাদের হাতে রয়েছে ‘শাহীন’ ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজের বিভিন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘আবাবিল’ ক্ষেপণাস্ত্র, যা একাধিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।

পারমাণবিক ও নৌশক্তি

পাকিস্তান একটি ঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেশটির হাতে আনুমানিক ১৭০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আফগানিস্তানের কোনো পারমাণবিক সক্ষমতা নেই। পাকিস্তানের ১২০টি নৌযান রয়েছে।

নৌশক্তির ক্ষেত্রেও ব্যবধান স্পষ্ট। আফগানিস্তান স্থলবেষ্টিত দেশ, তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই। বিপরীতে পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ নৌবাহিনী পরিচালনা করে, যেখানে রয়েছে আটটি সাবমেরিন, নয়টি ফ্রিগেট, ছয়টি করভেট এবং বহু টহল জাহাজ।

প্রতিরক্ষা ব্যয়

অর্থনৈতিক সামর্থ্য সামরিক সক্ষমতার বড় ভিত্তি। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে ৩৮তম স্থানে। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন ডলার, অবস্থান ১৩৬তম।

এই বিশাল পার্থক্য সরাসরি প্রভাব ফেলে অস্ত্র কেনা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে।

কৌশলগত বাস্তবতা

ইসলামাবাদ বারবার কাবুলের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি’ এবং টিটিপি ‘পাকিস্তানি তালেবান’দের সমর্থনের অভিযোগ তুলেছে। কাবুল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর ঘটে। অক্টোবরে প্রাণঘাতী ঘটনা এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আফগানিস্তানের সক্রিয় সামরিক শক্তি পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। উভয়পক্ষই নিজেদের সাফল্যের দাবি করলেও পরিসংখ্যান বলছে, প্রচলিত সামরিক শক্তির হিসেবে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে।

তবে বাস্তবতা হলো, সীমান্ত সংঘাত কেবল ট্যাংক, জেট বা বাজেটের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, অনিয়মিত যুদ্ধকৌশল, স্থানীয় সমর্থন এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনেক সময় কাঁচা সামরিক শক্তিকেও ছাপিয়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার এই সীমান্তে তাই সংখ্যার বাইরে আরও বহু স্তরের হিসাব কাজ করে বল মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।