logo

ইহুদিদের একত্রিত করছে ইসরায়েল, ভারত থেকে গেল ২৫০ জন

ইহুদিদের একত্রিত করছে ইসরায়েল, ভারত থেকে গেল ২৫০ জন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের এক জায়গায় আনছে ইসরায়েল সরকার। যেন তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ‘মসীহ’ বা ত্রাণকর্তার আগমন সহজ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতে থাকা ‘বনে মেনাশ’ গোষ্ঠীর ইহুদিদের ইসরায়েলে ফেরাতে শুরু করেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার। ক্রমান্বয়ে অন্তত ৬০০ জনকে ইসরায়েলে পুনর্বাসন করা হবে। এর প্রথম ধাপে ২৫০ জন গত ২৩ এপ্রিল ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবতরণ করেছেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ১ হাজার ২০০ অতিরিক্ত অভিবাসী আসবে বলে আশা করছে ইসরায়েলি সরকার। আর ২০৩০ সালের মধ্যে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৬ হাজার সদস্যের সম্পূর্ণ স্থানান্তর সম্পন্ন হবে। এই বৃহত্তর উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজোরাম ও মণিপুর রাজ্যে বসবাসকারী ‘বনে মেনাশে’ সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সদস্যদের ইসরায়েলে নিয়ে আসা। 

ইসরায়েলের আলিয়াহ ও একীকরণ মন্ত্রণালয় এবং ইহুদি সংস্থার (জাফি) পরিচালিত এই কর্মসূচির নাম ‘উইংস অফ ডন’। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার সঙ্গে রয়েছেন আলিয়াহ ও ইন্টিগ্রেশন মন্ত্রী ওফির সোফার ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনসংখ্যা ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, ধর্মান্তর কর্তৃপক্ষসহ একাধিক সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠন ও ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 

তারা বলছেন, ‘বনে মেনাশে’ গোষ্ঠীর সদস্যরা থাকেন মণিপুর ও মিজোরামের পাহাড়ি এলাকায়। বর্তমানে তারা ‘কুকি‘ বলেই পরিচিত। কিন্তু এই জনগোষ্ঠী ইতিহাসের অংশ। ‘বনে মেনাশে’-ই ইহুদিদের ১০টি ‘লস্ট ট্রাইব’-এর একটি। ইসরায়েলের একটি ঘোষিত নীতি রয়েছে যে, ইহুদিরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, তারা যে কোনো সময়ে সেই দেশে ফিরতে পারেন। ‘বনে মেনাশে’কে সে হিসেবেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইসরায়েলে।

তবে বৃহস্পতিবার ২৫০ জনকে তেল আবিবে নিয়ে যাওয়ার পেছনে মণিপুরের গোষ্ঠী সংঘর্ষের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী ওফির সোফার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘প্রতি বছর বনে মেনাশে গোষ্ঠীর ১২০০ ইহুদিকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’ এর জন্য গত বছর (২০২৫) বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেছে বিবি নেতানিয়াহুর সরকার।

‘শাভেই ইসরায়েল’ নামে একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ‘বনে মেশাই’ সম্প্রদায়ের প্রায় ৭ হাজার সদস্য এখনও ভারতে অবস্থান করছেন। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

খ্রিস্টান ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেল অনুসারে, ১২টি গোত্রের মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল প্রাচীন ইসরায়েল। এর মধ্যে যোসেফের পুত্রদ্বয় এফ্রাইম আর মনশের থেকে জন্ম নিয়েছিল দু’টি গোত্র। ‘বনে মেনাশে’রা নিজেদের সেই মনশের বংশধর বলে দাবি করেন। ৭২২ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে অ্যাসিরীয়রা হামলা চালায় ইসরায়েলে।

এতে ছন্নছাড়া হয়ে যায় ইসরায়েলের ১০টি গোষ্ঠী। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেনাশে পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত ও চীন পেরিয়ে চলে আসে ভারতে। এর পরে ধীরে ধীরে মণিপুর ও মিজোরামে বসতি গড়ে তোলেন তারা।

মণিপুরে অধিকাংশ কুকি-ই এখন খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু বনে মেনাশেরা এখনও ধরে রেখেছেন নিজেদের ধর্ম পরিচয়। নিজেদের ইহুদি সত্ত্বা। মেনাশেদের দেখতে ঠিক ইহুদিদের মতো নয়। মুখের গঠনে একটা মঙ্গোলিয়ান ছাপ আছে। এক দেখায় অরুণাচল বা মণিপুরের মানুষদের থেকে তফাৎ করা যায় না।

ইসরায়েল তাদের কেন ফেরাচ্ছে

বনে মেনাশেরা মূলত কৃষক। মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় তাদের জমিজমাও রয়েছে। কৃষিকাজ করেন। কিন্তু আয় খুব কম। তাই ইসরায়েলে ফিরে যেতে চান তারাও। ২০২৩ সালে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে ইসরায়েলেও শ্রমিক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে তারাও আগ্রহী।

গত কয়েক দশকে প্রায় পাঁচ হাজার বনে মেনাশে ইসরায়েলে ফিরে গেছেন। সেখানে অধিকাংশই ট্রাক চালান। কিংবা শ্রমিকের কাজ করেন। বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ডলার আয় হয়। সেখানে ভারতে তাদের আয় হতো ১ হাজার ২০০ ডলার মতো। ইহুদি ফিরে যাওয়ার আগে মেনাশে গোষ্ঠীর এক ব্যক্তি বলেন, ‘ভারত জন্মভূমি। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের নাড়ির টান। ফিরতে হবেই।’

সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট, টাইমস অব ইসরায়েল, হিন্দুস্তান টাইমস