তেহরান থেকে রওনা হননি প্রতিনিধিরা, শান্তি আলোচনা নিয়ে শঙ্কা

লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্ধারিত শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান থেকে এখনও রওনা হননি ইরানের প্রতিনিধিরা। তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো আব্বাস আসলানি শুক্রবার (১০ এপ্রিল) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আব্বাস আসলানি সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে জানান, ‘ইরানি প্রতিনিধি দল তেহরান ত্যাগ করেনি। তাদের পরিষ্কার কথা, যতক্ষণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলবে, ততক্ষণ ইসলামাবাদে কোনো আলোচনা হবে না।’
তিনি আরও জানান, ১০ দফা যে পরিকল্পনাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে সরে আসছে। এটি আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার চরম সংকট তৈরি হয়েছে। আসলানি বলেন, ‘ইরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো ভরসা নেই। দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনা চলার মধ্যেও দুইবার ইরানের ওপর হামলা হয়েছে, তবে কেন আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে?’
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হওয়া এবং ওয়াশিংটনের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এ ছাড়া লেবানন প্রসঙ্গ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি প্রধান অংশ ছিল বলে জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ ছিল লেবানন। এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করা হলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ।’
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘ইরানের মিত্র হিসেবে লেবানন এবং সমগ্র প্রতিরোধ অক্ষ এই যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে এর জন্য সুনির্দিষ্ট মূল্য চুকাতে হবে এবং এর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত কঠোর।’
এদিকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করা হবে না বলে জানিয়েছে দেশটির পারমাণবিক শক্তি সংস্থা। খবরে জানানো হয়, ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি বলেছেন, ‘দেশের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কমানো হবে না।’
ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সির (আইএসএনএ) প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মোহাম্মদ ইসলামি বলেছেন, ‘শত্রুরা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করার চেষ্টায় সফল হবে না।’
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘কথার ফুলঝুরি যতই হোক, মূল কথা হলো, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এবং হরমুজ প্রণালি খোলা ও নিরাপদ রাখা হবে। আমাদের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত আছে ও বিশ্রাম নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তারা পরবর্তী সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করছে।’
বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এক চুক্তিতে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। লেবাননে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমতাবস্থায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হলে ইরানে পুনরায় কিন্তু আগের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারা জানিয়েছে, চুক্তি সম্পূর্ণরূপে পালিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন সামকির বাহিনী ইরান ও তার আশপাশে অবস্থান করবে।
যে কোনো সময় চুক্তিটি ভেস্তে যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি অনুসরণ না করার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। যদি কোনো কারণে তা না হয়, তাহলে দুলর্ভ ও আগের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী গোলাগুলি শুরু হবে।’
যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তমতো হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় আবারো সমুদ্রপথটি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। বৈশ্বিক জাহাজ-ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে কোনো তেল বা গ্যাস ট্যাংকার প্রণালিটি অতিক্রম করেনি। তবে চারটি বাল্ক ক্যারিয়ার অর্থাৎ শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ পার হতে পেরেছে।
ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রণালিটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি ট্যাংকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনগুলোর পর থেকে কোনো জাহাজকে প্রণালিটি অতিক্রম করতে দেখা যায়নি।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা অসত্য।’