ইউক্রেনের চার বছরের যুদ্ধ রাশিয়াকে যেভাবে বদলে দিয়েছে

প্রায় চার বছর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ঘোষণা করেছিলেন যে রুশ সেনাবাহিনী ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করেছে। রাশিয়ান ভাষায় এ যুদ্ধকে বলা হয়েছে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’। এ সংঘাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে চলছে।
বিবিসি এবং স্বাধীন রাশিয়ান সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনা জানিয়েছে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা এখন ১ লাখ ৮৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটা আফগানিস্তানের যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মোট হতাহতের প্রায় ১৩ গুণ। এ সংঘাতের কারণে লাখ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী পালিয়ে গেছে। বিশেষ করে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তীব্র শীত থেকে প্রাণে বাঁচতে এসব মানুষ পালাচ্ছেন। এ যুদ্ধ রাশিয়াকেও বদলে দিয়েছে। এ বিষয়ে আলজাজিরা দেশটির ভেতরের এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। তারাই জানিয়েছেন যে কীভাবে এ দীর্ঘ যুদ্ধ রুশদের জীবন বদলে দিয়েছে।
রুশ-ইউক্রেন সীমান্তে এ যুদ্ধের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী পশ্চিম রাশিয়ার অঞ্চলগুলো হচ্ছে কুর্স্ক ও বেলগোরোড এলাকা। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা এমনকি স্থল আক্রমণের শিকার হয়েছে এসব এলাকা। এর ফলে কুর্স্কের কিছু অংশ অস্থায়ীভাবে ইউক্রেনীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণেও চলে এসেছিল।
এ বিষয়ে ২৫ বছর বয়সি ইউটিউবার বেন দ্য ব্রিট বলেন, মাত্র এক বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন ইউক্রেনীয় বাহিনী এই অঞ্চলে ছিল, তখন আপনি এখানে থাকলে প্রতিদিন একাধিকবার সামরিক হামলার শিকার হতেন।
বেন ২০২১ সালে তার রাশিয়ান স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসের জন্য কুর্স্কে চলে এসেছিলেন। তিনি জানান, এসব হামলায় স্থানীয়রা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি আমিও এখন আর এসব বিষয় আমলে নেই না।
বেন দ্য ব্রিট বলেন, মাত্র এক বছরেরও বেশি সময় আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলা বা গোলাবর্ষণের সময় কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেত না। কারণ এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়।
স্থানীয় গণমাধ্যম ফনার টিভি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেলগোরোড অঞ্চলে ইউক্রেনীয় হামলায় কমপক্ষে ৪৫৮ জন বেসামরিক রুশ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
কিন্তু মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় বড় শহরগুলোতে যুদ্ধের তীব্রতা অনুভূত হয়নি। তবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের দ্বারা আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
এ বিষয়ে মস্কোর বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সি আন্দ্রে আলজাজিরার প্রতিনিধিকে বলেন, এখানে (মস্কোতে) জীবনযাত্রা অনেক ব্যয়বহুল। এ বিষয়টি আমাকে হতবাক করে। এমনকি যদি আপনি কেবল কিছু বিয়ার, সিগারেট এবং চকলেট কিনেন, তবুও আপনাকে দোকানে কমপক্ষে ১,০০০ রুবেল [$১৩] খরচ করতে হবে। কিন্তু মস্কোতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্পষ্টতই খুব বেশি কমেনি। সুপারমার্কেট-ক্যাফেতে বাচ্চারা ভিড় করছে। পুরো শহর ট্যাক্সি ড্রাইভার এবং অন্তহীন ডেলিভারি ড্রাইভারে পরিপূর্ণ। এ শহর ঠিক ইউরোপের মতো ব্যয়বহুল।
তবে কিছু জিনিস বদলে গেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গের ৩৯ বছর বয়সি ফটোগ্রাফার কিরিল এফ (ছদ্মনাম) বলেন, আগে যে (বিদেশি) ব্র্যান্ডগুলো পাওয়া যেত, সেগুলো এখন হয় দোকানে আর বিক্রি হয় না, অথবা দাম খুব বেশি। তবে চীনা ও দক্ষিণ কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলো রাশিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন অ্যাপে বিদেশি পেমেন্ট বিধিনিষেধ এড়াতে কিরিল কিরগিজস্তানে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। তিনি আরও জানান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কোনও অপ্রতিরোধ্য বাধা নয়। তবে এটি একটি বিরক্তিকর বিষয়। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ইউটিউব এবং ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া রাশিয়ায় ব্লক করা হচ্ছে। এ কারণে বিকল্প অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়। এসব বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। তরুণরা এটিকে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখে এবং তারা রাষ্ট্রকে ঘৃণা করে বড় হবে।
অপরদিকে বিভিন্ন জনমত জরিপগুলো জানাচ্ছে যে রুশ জনগণ এ যুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন জানাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে অপরাধী করে তোলার আইনগুলো এই জরিপের সঠিকতা বিচার করা কঠিন করে তুলেছে।
উদাহরণ স্বরূপ, দক্ষিণ-পশ্চিম রাশিয়ার সারাতোভের ৩০ বছর বয়সি ভ্লাদিস্লাভের ভাই এক মাস আগে রাশিয়ান বাহিনীতে ড্রোন পাইলট হিসেবে নাম লেখান। যদিও রুশ সামরিক বাহিনী এখন নিয়োগপ্রাপ্তদের ওপর নির্ভর না করে উদার বেতনের প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ কারণে প্রচুর বিদেশি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে।
ভ্লাদিস্লাভ বলেন, ক্রেমলিন ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বে ইউক্রেনীয় সরকারকে নাৎসিপন্থি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ কারণে স্বস্তিকা, এসএস খুলি এবং ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের অন্যান্য প্রতীকের ছবি পোস্ট করতে শুরু করেছে ইউক্রেনীয়রা। তাই আমি মনে করি - ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কারণ, রুশ কর্তৃপক্ষ দেশটিকে নাজিমুক্ত করতে চাচ্ছে।
তবে সাবেক সৈনিক আলেকজান্ডার মেদভেদেভ বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমি ধরে নিয়েছিলাম যে রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপ সমগ্র ইউক্রেনীয় জনগণের জন্য নয়, বরং ওই দেশের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি শাস্তিমূলক অভিযান। পরে বুঝতে পারি যে এ যুদ্ধে কারো কোনো লাভ হচ্ছে না। এ সংঘাতের ফলে কেবল মৃতদেহ, বিধবা, এতিম এবং দুর্দশাগ্রস্ত মা ও বাবার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এই পৃথিবীর কারও জন্যই এ যুদ্ধ ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
অপরদিকে যুদ্ধের প্রথম বছরে প্রায় দুই মিলিয়ন রাশিয়ান তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করেছিল। কারণ, রুশ যুবকরা ভয়ে ছিলেন যে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে। একইসঙ্গে অনেকের পুতিনবিরোধী মনোভাব ছিল। যেমন রাশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম শহর থেকে আসা ৩৫ বছর বয়সি মাইক (ছদ্মনাম)।
তিনি জানান, পুতিনের সরকার এই শীতের মধ্যে ইউক্রেনের জ্বালানি ও নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা সত্যিই অমানবিক আচরণ। এ কারণে রুশবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ানরা পশ্চিমা দেশগুলো ভালো কাজ পাচ্ছে না। এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত যুদ্ধ থামানো।