বিপর্যয়ের মুখে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ছে মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ড

একদিকে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা, অন্যদিকে একের পর এক অভ্যন্তরীণ সমস্যায় বিপর্যস্ত বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। সম্প্রতি জাহাজে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং টয়লেটসহ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার প্রায় বিকল অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরিটিকে এখন লোহিত সাগর ছেড়ে মেরামতের জন্য গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে রওনা হতে হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
লন্ড্রি সেকশনে লাগা অগ্নিকাণ্ডে রণতরিটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। প্রায় ২০০ জন নাবিক ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধ্বংস হয়ে গেছে নাবিকদের থাকার অন্তত ১০০টি শয্যা।
অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আহত এক সেনা সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, জাহাজের ইঞ্জিন ব্যবস্থা সচল রয়েছে, তবে বিশাল এই ক্ষয়ক্ষতির পর এর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
টানা নয় মাস সমুদ্রে অবস্থান করায় জাহাজের চার হাজার নাবিকের মনোবল এখন তলানিতে। দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি ও বিদেশের মাটিতে অবস্থান নাবিকদের মধ্যে মানসিক চাপের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের পর নাবিকদের মানসিক অবসাদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
টয়লেট ব্যবস্থার খারাপ অবস্থা
কেবল যুদ্ধ আর দুর্ঘটনা নয়, বরং জাহাজের শৌচাগার তথা টয়লেট ব্যবস্থা নিয়েও চরম বিপাকে পড়েছেন রণতরিতে থাকা ক্রুরা। ড্রেন জ্যাম হয়ে যাওয়ায় টয়লেটের সামনে নাবিকদের দীর্ঘ লাইন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২০ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই জাহাজের টয়লেট পরিষ্কারের জন্য প্রতিবার অ্যাসিড ফ্লাশ করতে খরচ হয় ৪ লাখ ডলার।
১৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই অত্যাধুনিক রণতরিটি এখন কবে নাগাদ আবার যুদ্ধের ময়দানে ফিরতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আপাতত লোহিত সাগরের রণক্ষেত্র ছেড়ে মেরামতের গন্তব্যই এখন এর একমাত্র পথ।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এই দীর্ঘায়িত মোতায়েনের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া সামরিক সিদ্ধান্তের কারণে নাবিকদের খাদের কিনারায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
যদিও নৌবাহিনী দাবি করেছে, তাদের কর্মীরা যে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম, তবে নাবিকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও মনোবল ভেঙে পড়ার খবর এখন প্রকাশ্যে।
ইরান অভিযানে বড় ধাক্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান অভিযানে মার্কিন বাহিনী এ পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ৭৫টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক রাডার সমৃদ্ধ এই রণতরিটি ছিল সেই অভিযানের প্রাণকেন্দ্র। ফলে ফোর্ডকে সরিয়ে নেওয়া হলে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ফোর্ডকে সরিয়ে নেওয়ার পর সম্ভবত ‘ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ’ রণতরিটি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হবে। এই রণতরিটি মধ্যপ্রাচ্যে আসার আগে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযান এবং ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটকের অভিযানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক জটিলতায় বিপর্যস্ত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই রণতরিটি এখন রণাঙ্গন ছেড়ে মেরামতের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।