প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ করতে গিয়েই রাজনীতিতে উত্থান, প্রশ্নফাঁসেই পতন

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মেডিকল ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে তার পদত্যাগের মূল দাবি জানিয়ে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের তীব্র চাপে পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশ্নফাঁসবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস। যে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের জেরে আন্দোলনের চাপে ধর্মেন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন, একই ধরনের ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরেই রাজনীতিতে উত্থান হয়েছিল তার।
সেটা প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। উড়িশ্যার উচ্চ মাধ্যমিক বা ‘প্লাস টু’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে তিনি ছাত্রদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে উড়িষ্যায় তৎকালীন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী জানকীবল্লভ পট্টনায়কের সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা ভগবত প্রসাদ মোহান্তি।
সে বছর ওড়িশ্যার উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদ (সিএইচএসই) পরিচালিত প্লাস টু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনের তীব্র চাপে ব্যাকফুটে চলে যায় তৎকালীন রাজ্য সরকার।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ভুবনেশ্বরে রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান। পরবর্তীতে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।
পরবর্তী সময়ে উড়িষ্যায় তৃণমূল স্তরে বিজেপির ভিত্তি শক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখেন ধর্মেন্দ্র। তার সেই অর্জনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে উড়িষ্যায় প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠন করে। ফলে বিজু জনতা দলের (বিজেডি) টানা দুই দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে।
আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রধানের সাবেক সহপাঠী প্রশান্ত রাউত এনডিটিভি-কে বলেন, আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে পুলিশের লাঠিচার্জে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সে সময় ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। তার শরীরের একাধিক হাড় ভেঙে যায়। তবে গুরুতর আহত হওয়ার পরও ধর্মেন্দ্র আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।
রাউত বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান এই আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন। প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী আমাদের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। লাঠিচার্জে তিনি গুরুতর আহত হলেও তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি।’

ছাত্রদের বিক্ষোভের পর ওড়িশ্যা সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। সংকট সমাধানে একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে রাজ্য পর্যায়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয় এবং সরকারের কাছে বিভিন্ন সুপারিশ পাঠানো হয়।
পরবর্তী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ছাড়াই সম্পন্ন হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৭ সালের এই আন্দোলনই ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। আর প্রায় তিন দশক পর, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে ঘিরেই তার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটল। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশনের (সিবিএসই) বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে তাকে বিতর্কের মুখে পড়তে হয়।
শনিবার (২৫ জুলাই) ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নিয়ম অনুযায়ী সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠালে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। টানা আন্দোলনের মাঝেই সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিনিধিরা দুই দফায় বৈঠকে বসেন।
তবে নিজেদের দাবিতে অনড় ছিলেন আন্দোলনকারীরা। এদিন বিকেলে তৃতীয় দফার আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে তিনি লেখেন, ‘গত চার দশক ধরে আমি দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে এসেছি। শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত গড়ে তুলতে পারে।’
ধর্মেন্দ্র জানান, চলতি বছরের ৩ মে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তিনি এর দায়ভার স্বীকার করেছিলেন। কখনোই নিজের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেননি। তার মূল লক্ষ্য ছিল কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত যেন নষ্ট না হয় এবং কারও সঙ্গে যেন অন্যায় না ঘটে।
এক্স পোস্টের খোলা চিঠিতে তিনি লেখেন, গত ১০ দিনের ঘটনাবলিতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত। যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি যাতে কোনো দেশবিরোধী শক্তি কাজে লাগাতে না পারে, দেশের ঐক্য বজায় থাকে, কোনো শিক্ষার্থী যাতে আইনি জটিলতায় না জড়িয়ে নিজের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিতে পারেন; সেসব বিবেচনা করেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
দেশের ‘তরুণ বন্ধুদের’ উদ্দেশ্যে ধর্মেন্দ্র লেখেন, নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার ছিল ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ২১ জুন পুনরায় নিট পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং ১৬ জুলাই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এই সময়টিতে কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন।
এদিকে এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও শক্তিশালী মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করায় উল্লাসে ফেটে পড়েন সিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা। ধর্মেন্দ্রর পদত্যাগের খবর যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পরই আনন্দাশ্রু ও উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে বিক্ষোভস্থল।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এই ঘটনাকে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই প্রমাণ করে যে, আপনারা যদি ভয় না পান এবং সরকারের কাছে মাথা নত না করেন, তবে যে কোনো নেতার পদত্যাগপত্র আদায় করা সম্ভব।’
এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব তিনি দেশের একতাবদ্ধ ছাত্র ও যুবসমাজকে দিয়েছেন।
.png)






