logo

যেভাবে ইরানের চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

যেভাবে ইরানের চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে নজিরবিহীন হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আগ্রাসনে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ তেহরানের শতবর্ষী প্রাচীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ হামলার শিকার হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কাছে ইরানে চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলার প্রতিকার চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কীভাবে ইরানের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছে তার একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে।

স্বাস্থ্যসেবার ওপর হামলা নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্টের বার্তা

বৃহস্পতিবার পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স পোস্টে লিখেছেন, হাসপাতাল, ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্র পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলার মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে?

পেশায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ৭১ বছর বয়সি এই প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), রেড ক্রস, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এবং বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকদের এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

পাস্তুর ইনস্টিটিউট আসলে কী?

বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্স পোস্টে লিখেছেন, আমেরিকান-ইসরায়েলিরা ইরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলা করেছে। এটি ১৯২০ সালে প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট এবং ইরান সরকারের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। ইরান তথা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যকেন্দ্র।

বাঘাই এই হামলাকে নিষ্ঠুর, ঘৃণ্য এবং বর্বর বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এই হামলায় কোনো হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করেননি। 

ইনস্টিটিউটটি মূলত সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করে। ভ্যাকসিন ও জৈবিক পণ্য তৈরির পাশাপাশি উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা দিয়ে থাকে এই প্রতিষ্ঠান। এটি গুটিবসন্ত ও কলেরার মতো মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি এবং হামের মতো রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করে ইরানের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে সহায়তা করে পাস্তুর ইনস্টিটিউট। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসাস শুক্রবার (৩ এপ্রিল) জানিয়েছেন, এই ইনস্টিটিউটের দুটি বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

ইরানের আর কোন কোন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা হয়েছে?

গেব্রেয়াসাস তার এক্স পোস্টে আরও জানান, ১ মার্চ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইরানে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর ২০টিরও বেশি হামলার সত্যতা যাচাই করেছে। এসব হামলায় একজন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন সদস্যসহ অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। হামলার শিকার হওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হলো—

রেড ক্রিসেন্ট গুদাম: শুক্রবার সকালে বুশেহর প্রদেশে ড্রোন হামলায় একটি রেড ক্রিসেন্ট ত্রাণ গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দুটি ত্রাণবাহী কনটেইনার, দুটি বাস এবং জরুরি যানবাহন ধ্বংস হয়েছে।

তৌফিক দারু: ৩১ মার্চ তেহরানে ইরানের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি তৌফিক দারুতে হামলা চালানো হয়। এটি ক্যানসার প্রতিরোধী, কার্ডিওভাসকুলার এবং ইমিউনোমোডুলেটরি ওষুধ তৈরি করত।

দেলারাম সিনা সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল: ২৯ মার্চ তেহরানে এই নবনির্মিত হাসপাতালটি হামলার শিকার হয়। হামলার সময় সেখানে ৩০ রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

আলী হাসপাতাল: ২১ মার্চ খুজেস্তান প্রদেশের আন্দিমেস্কে এই হাসপাতালে বিস্ফোরণ ঘটে। এর পর হাসপাতালটি সেবা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

গান্ধী হাসপাতাল: ২ মার্চ তেহরানে একটি টেলিভিশন টাওয়ারে হামলার সময় গান্ধী হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মতে, হাসপাতালসহ সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিটের ওপর কোনোভাবেই হামলা চালানো যাবে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে তা স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই সুরক্ষা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় অসুস্থ এবং আহত ব্যক্তিরা ছাড়াও চিকিৎসাকর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্সের মতো পরিবহন ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।

২০১৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ২২৮৬ নম্বর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং সব রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়।

ডব্লিউএইচওর ‘সারভেইল্যান্স সিস্টেম ফর অ্যাটাকস অন হেলথ কেয়ার’ (এসএসএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সশস্ত্র হামলায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার রেকর্ড সংখ্যক ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এসএসএ জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র সংঘাতগুলোতে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে এক হাজার ৩৪৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে এক হাজার ৯৮১ জন নিহত হয়েছেন। এই প্রাণহানির সিংহভাগ ঘটেছে সুদানে, যেখানে এক হাজার ৬২০ জন নিহত হয়েছেন এবং এরপর মিয়ানমারে নিহত হয়েছেন ১৪৮ জন। ২০২৪ সালেও সশস্ত্র হামলায় ৯৪৪ রোগী এবং চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছিলেন।