গাজাগামী ফ্লোটিলার বহরে ইসরায়েলি অভিযানে আটক ১৭৫

ফিলিস্তিনের গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার বহরে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ভূমধ্যসাগরে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি নৌবাহিনী অন্তত ১৭৫ জনকে আটক করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
আয়োজক সংগঠন গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ত্রাণবাহী এই নৌবহরের ৫৮টি নৌযানের মধ্যে ২২টি ইসরায়েলি বাহিনী আটক করেছে। এটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি ‘জলদস্যুতা’।
সংগঠনটির তথ্যমতে, গাজা থেকে প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা অবস্থায় নৌযানগুলোতে অভিযান চালানো হয় এবং তাতে থাকা অধিকারকর্মীদের বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালি থেকে মোট ৫৮টি নৌযানের এই বহর যাত্রা শুরু করে। ২২টি নৌযান আটক করে দেওয়ায় অবশিষ্ট ৩৬টি নৌযান ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা জানায়, ইসরায়েলি নৌবাহিনী বৃহস্পতিবার ভোরে একাধিক নৌযান আটক, তল্লাশি চালায়। এ সময় তারা বিভিন্ন নৌযানের ইঞ্জিন ভেঙে ফেলে ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বহরে থাকা বিভিন্ন দেশের ১৮০ জনের বেশি অধিকারকর্মী সরাসরি ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও গাজার ওপর আরোপিত ‘বৈধ নৌ অবরোধ’ ভাঙার চেষ্টা ঠেকাতে এই অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং অভিযানটি ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ পরিচালিত হয়েছে।
ইসরায়েলের দাবি, ফ্লোটিলার আয়োজকরা হামাসের সাথে হাত মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন দিকে মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বলেন, গ্রিক সরকারের সাথে সমন্বয় করে ফ্লোটিলার নৌযান থেকে আটক ব্যক্তিদের গ্রিসের একটি সৈকতে নামিয়ে দেওয়া হবে।
তবে গ্রিক সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ঘটনাটি গ্রিসের জলসীমার বাইরে ঘটেছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আগে থেকে গ্রিসের সাথে কোনো সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় গ্রিসের তল্লাশি বা উদ্ধার অভিযান ছাড়া অন্য কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে গ্রিস যেকোনো প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গ্রিক কোস্টগার্ডকে জানায়, ফ্লোটিলার ১৭টি নৌযান আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিত্যক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। ওইসব নৌযানে থাকা ব্যক্তিদের ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজে নেওয়া হয়েছে এবং তারা সুস্থ আছেন।
এদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আটক ইতালীয় নাগরিকদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। ইতালির গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৪ ইতালীয় নাগরিক ইসরায়েলের হাতে আটক হয়েছেন।
এ ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র আনোয়ার এল আনৌনি ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
ফ্লোটিলায় থাকা এক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক তারিক রাউফ বলেন, আমরা গাজার অবরোধ ভাঙার দাবিতে আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি উদ্বেগজনক।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরেও একই ধরনের একটি বহর গাজায় পৌঁছাতে বাধা দেয় ইসরায়েল। তখন ৪৭০ জনের বেশি কর্মীকে আটক করে পরে ফেরত পাঠানো হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রায় ২১ লাখ মানুষ খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যসেবা সংকট এবং অব্যাহত হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত গাজায় ৭২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।