logo

নির্বাচনের পর ড. ইউনূসকে কীভাবে স্মরণ করবে বাংলাদেশ

নির্বাচনের পর ড. ইউনূসকে কীভাবে স্মরণ করবে বাংলাদেশ

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনে পর বাংলাদেশের দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর নেতৃত্ব দেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্বকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, সংস্কার কার্যক্রম, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করছে তার সরকার। দীর্ঘদিন পর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পেতে যাচ্ছে ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে এতসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার পর নির্বাচনপরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসকে কীভাবে স্মরণ করবে বাংলাদেশ, সে প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে নিজের অটোরিকশা চালাচ্ছিলেন রুবেল চাকলাদার। এ সময় তাকে রাগান্বিত নয়, বরং বেশি হতাশ মনে হচ্ছিল। ৫০ বছর বয়সি রুবেল জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার ক্ষমতার অবসান ঘটে। ১৫ বছরের এই শাসনামলে স্বৈরতন্ত্রের অভিযোগ, বিরোধীদের দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উঠে এসেছিল।

রুবেলের মতে, এ ঘটনার পর যে বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ তা নষ্ট করে ফেলেছে।

ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ফলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এর তিন দিন পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তার সামনে ছিল একটি অস্থিতিশীল দেশকে স্থিতিশীল করার কঠিন কাজ, যেখানে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি প্রাণ দেন।

বর্তমানে ৮৫ বছর বয়সি মুহাম্মদ ইউনূস তার দায়িত্বের লক্ষ্য নির্ধারণে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে এমন সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে চান। যাতে দেশে আবারও স্বৈরশাসনের ফিরে আসা ঠেকানো যায়।

রুবেলের মতে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল (প্রশাসনের ভেতরের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দল) অন্তর্বর্তী এই নেতাকে তার ১৮ মাসের শাসনামলে আরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট সমর্থন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমরা সুযোগটি হাতছাড়া করেছি। ড. ইউনূসকে সঠিকভাবে কাজ করতে দেইনি। কে তার কাছ থেকে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি? এই দেশ কখনো ভালো হবে না। জুলাই মাসে মানুষ বিনা কারণে তাদের জীবন দিয়েছে।’

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই দেশের ইতিহাসে সম্ভবত এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী এক রূপান্তরের অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ যখন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখনই ইউনূসের উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক সময় যারা তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন এখন তারাই বিতর্ক উসকে দিচ্ছেন। এই বিতর্কের মূল প্রশ্নটি হলো ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা মুহাম্মদ ইউনূস কি অবিচল ও দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন? নাকি তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন?

‘সর্বজন গৃহীত’

যেসব ছাত্রনেতা এই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের কাছে ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও তার সুনাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যখন কিনা পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশ বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে চাইছিল যে, তারা কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে না।

সাবেক ছাত্রনেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সে সময়ে আমাদের এমন একজন মানুষ দরকার ছিল, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এমনকি যখন আমরা বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছি, তখন মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়া আর কাউকে পাইনি।’

শেখ হাসিনার পতনের কয়েক দিন আগে ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করা আরেক ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, তাদের হিসাবও একই রকম; প্রাতিষ্ঠানিক পতন ও বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করার জন্য নৈতিক কর্তৃত্বসম্পন্ন কারও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ইউনূসের নিয়োগকে একমত হয়ে স্বাগত জানায়নি। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভেতরে এ নিয়ে আপত্তি ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, সে সময় ছাত্রনেতা ও সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া আলোচনায় এসব আপত্তির কথা উঠে এসেছিল।

তবে আলজাজিরা নিজে থেকে এই দাবি যাচাই করতে পারেনি।

সেনাবাহিনীও ইউনূসের নিয়োগ নিয়ে তাদের ভেতরের আলোচনা প্রকাশ্যে জানায়নি। আর শেখ হাসিনার সময়ে নিয়োগ পাওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ও নিজ পদে বহাল ছিলেন।

ইউনূস প্রথম দিকে দায়িত্ব নিতে দ্বিধা করেছিলেন বলেও জানা যায়। জোর দিয়ে বলেছিলেন, তিনি ‘রাজনৈতিক মানুষ নন’। কিন্তু আন্দোলন যখন আরও তীব্র হয় এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন তিনি দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন। 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের ভাষায়, এটি ছিল ‘দায়িত্ববোধের এক মুহূর্ত’। তিনি বলেন, ‘এগিয়ে আসার দায়বদ্ধতা তিনি (ইউনূস) অনুভব করেছিলেন।’ 

রীয়াজকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি (সংবিধান সংস্কার) নিয়ে গঠিত একটি কমিটির প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বেছে নিয়েছিলেন।

তবে ১৮ মাস পর এসে ইউনূসকে সমর্থন করেছিলেন এমন মানুষদের মধ্যেও এখন হতাশা আর সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার অনুভূতি রয়ে গেছে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার চেয়েছিলাম। সেটা সম্ভব হয়নি। তবুও আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি কঠোর ও গভীর সংস্কার আশা করেছিলাম।’

ন্যায়বিচারের জন্য চাপ

ইউনূস বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই অন্তর্বর্তী সরকার যিনি চেষ্টাকৃত সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ও বিতর্কিত সংস্কার প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। নির্বাচিত সংসদের অনুপস্থিতিতে, তার প্রশাসন একটি সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার আগে শাসনের ব্যর্থতা শনাক্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার নথিভুক্ত এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়।

ইউনূসের প্রশাসন নানা সংস্কার ও তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল; যেখানে নির্বাচন, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ এবং হাসিনার প্রশাসনের সময় করা বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল। যার মধ্যে সমালোচকদের গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক নিখোঁজ করা বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যে বিচার ব্যবস্থা হাসিনার শাসনের সময় দমনমূলক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ছিল, তা ইউনূসের সময়ে আরও স্বাধীন ভূমিকা গ্রহণ করে অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ, সেনা জেনারেল, পুলিশ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিচার করার নির্দেশ দেয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং অন্যান্য মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। একইসঙ্গে হাসিনার সঙ্গে সংযুক্ত আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়।

মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে সংবেদনশীল উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি ছিল ২০০৯-২০২৪ সালের মধ্যে হাসিনার শাসনের সময়ে গুম ও বন্দিশালার বিষয়টি মোকাবিলা করা।

তিনি গুম কমিশন গঠন করেছিলেন; তাতে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছিল। যার মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি মামলা যাচাই করেছে এবং ২৮৭ জনকে নিখোঁজ বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ করা হবে) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সংযুক্ত ছিল।

ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির সহযোগী ফেলো মুবাশ্বার হাসানকে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অপহরণ করা হয়। ৪৪ দিন পরে একটি হাইওয়েতে চোখ বন্ধ করে ফেলে দেওয়ার পর বাড়ি ফেরেন তিনি। গুম কমিশনকে ইউনূসের ‘সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। মুবাশ্বার বলেন, ‘এটি প্রমাণ করেছে যে, শেখ হাসিনার শাসনের সময় সংঘটিত অপরাধগুলো ‘সিস্টেম্যাটিক’ ছিল।’

তিনি ইউনূসকে আয়নাঘর বা ‘হাউস অব মিরর’ উন্মোচন করার জন্য ধন্যবাদ দেন, যা হাসিনা যুগের গোপন বন্দিশালা হিসেবে পরিচিত ছিল।

তবে মুবাশ্বার মনে করেন, কমিশন আরও অধিক দায়িত্ব পালন করতে পারত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কমিশন সফল হয়েছে, তবে এটি আরও বড় হতে পারত।’

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল। বিশ্ব সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশি নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, ইউনূসের শাসনামলে আরেকটি আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের  ক্ষেত্র ছিল, যা প্রত্যাশিতভাবে পূরণ হয়নি। 

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘প্রত্যাশা ছিল যে ইউনূস একটি দৃঢ় আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি হবেন, যারা নিয়মিতভাবে নাগরিকদের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। কিন্তু কাঠামোগত প্রতিরোধ ও অনির্বাচিত ম্যান্ডেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি তা করতে ব্যর্থ হন।’

সংস্কারের ওপর গণভোট

ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব কাজ করার জন্য ব্যবহার করছেন : যেখানে সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং তা সরাসরি ভোটারদের কাছে একটি গণভোটের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

ইউনূসের সমর্থকদের মতে, হাসিনার সময়ে রাজনৈতিক আদালত থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতার যে অপব্যবহার হয়েছিল তা ভাঙতে হলে অবশ্যই জনগণের সম্মতি প্রয়োজন।

যদি গণভোটে হ্যাঁ অনুমোদিত হয় তাহলে আগামী সংসদ ওই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে। আর অনুমোদন না দিলে, এই সংস্কার উদ্যোগগুলো স্থগিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সেই অনিশ্চয়তাই ইউনূসের উত্তরাধিকারকে স্পষ্ট করবে।

সিডনিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বার হাসান বলেন, ‘তিনি এমন এক মুহূর্তে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যখন বাংলাদেশ ভেঙে পড়তে পারত। ইতিহাস বিচার করবে তার চলে যাওয়ার পর কী টিকে থাকবে।’

অবশ্য দিলারা চৌধুরী ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘তার নেওয়া উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত সফল হবে নাকি ব্যর্থ হবে, তা একমাত্র বিবেচ্য নয়। তিনি জাতির ইতিহাসে স্থায়ী ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকবেন।’

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ইউনূসের উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। কারণ তারা এ মাসের শেষের দিকে একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের চেষ্টা করছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ স্বীকার করেছেন, ইউনূস দেশের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রেখেছেন। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, নির্বাচিত নয় এমন সরকার কতটা এগোতে পারত।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাদের সবকিছু করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু কিছু সমস্যা নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে এসে সংসদের মাধ্যমে সমাধান করতে পারত।’

বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা ‘অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়।’ তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির থাকায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর ছিল।

তবুও বিএনপি নেতা ইউনূসের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করার সিদ্ধান্তকে ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (ইউনূস) যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন, তার কতটা পরবর্তী সংসদ গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করবে তা এখনো অনিশ্চিত।’

হাসিনার পতনের পর ইউনূসের নিয়োগ সমর্থন করা জামায়াতে ইসলামীও একই মন্তব্য করেছে।

জামায়াতের নেতা আব্দুল হালিম বলেন, ‘তিনি (ইউনূস) সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছেন। তবে সংস্কারের জন্য সময় প্রয়োজন। এই সরকারের সাফল্যকে সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।’

‘অন্ধের দেশ’

যেসব ছাত্রনেতা ইউনূসকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের মধ্যে শ্রদ্ধা ও হতাশা উভয়ই মিশে আছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, ইউনূসের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা কঠিন ছিল। 

তিনি বলেন, ‘তিনি (ইউনূস) ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার সরকার রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল।’

ঐকমত্য পোষণ করে আসিফ মাহমুদ জানান, ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও দেশে তিনি সংগ্রাম করেছেন। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের আরও শক্তিশালী অবস্থান প্রয়োজন ছিল।’

তবে সানজিদা খান দীপ্তির জন্য ইউনূসকে বেশি মনে রাখা হবে। কারণ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণের বিনিময়ে তার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দীপ্তির ১৭ বছর বয়সী ছেলে আনাস ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের চরম সময়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল।

দীপ্তি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের সন্তানদের জীবন দিয়েছি।’

ঢাকার যানজটে রুবেল বসুন্ধরা এলাকায় অটোরিকশা ধীরে চালিয়ে থামলেন এবং পারিবারিক রহস্য শেয়ার করে বললেন, তার স্ত্রী ও মেয়ে এখনও হাসিনার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং তিনি তাদের অন্য মতে রাজি করাতে পারেননি। এ কারণেই তার ফেব্রুয়ারি ১২-এর নির্বাচনের প্রতি খুব আশা নেই।

তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি তবুও ভোট দেব। পরিবর্তনের আশা করে নয়, বরং আর কোনো উপায় নেই। আমি বিশ্বাস করি না নির্বাচন আমার জীবনে বা দেশের কোনো বড় পরিবর্তন আনবে।’