এবার ৩৮৬ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায় বিএসএফ

পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আটক থাকা নথিবিহীন অন্তত ৩৮৬ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। রাজ্যের আটটি সীমান্তবর্তী জেলার ১৩টি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক কেন্দ্রে আপাতত তাদের রাখা হয়েছে। শিগগিরই তাদের বাংলাদেশ ঠেলে দেওয়া হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত হোল্ডিং সেন্টারেই তাদের থাকছে হবে।
শুক্রবার (২৯ মে) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। প্রতিবেদনে আটকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাবি করা হয়েছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটের তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩৩৫ জন নথিবিহীন অভিবাসীকে আটক রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৯ জন নারী ও ৯৫ জন শিশু রয়েছে। এ ছাড়া মুর্শিদাবাদে ১৯ জন, মালদায় নয়জন এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে আটজন নথিবিহীন অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজ্যের সব জেলায় অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এসব আটক কেন্দ্রে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের নির্বাসনের আগে রাখা হবে।
ঘোষণার পরপরই কয়েক ডজন নথিপত্রহীন তথাকথিত বাংলাদেশি অভিবাসী বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য উত্তর ২৪ পরগনার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে হাকিমপুরে বিএসএফ চেকপোস্টের কাছে জড়ো হন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘তাদের সবাইকে বসিরহাটের আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে’।
তৃতীয় একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রথম ঢেউটি অনেক বড় ছিল। তখন হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত এলাকায় জড়ো হয়েছিল। দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয় গত মঙ্গলবার। এখন পর্যন্ত আমরা বিএসএফ চেকপোস্টের বাইরে মাত্র ১০০ জনের মতো বাংলাদেশির জড়ো হওয়ার খবর পেয়েছি।
পশ্চিমবঙ্গের একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো হওয়াদের মধ্যে ১০০ জনকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে হস্তান্তর করেছে বিএসএফ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ঘোষিত হোল্ডিং সেন্টারে প্রায় ৩৫০ জনকে আটক রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে এই ১০০ জনকে বিজিবি-বিএসএফের সমঝোতায় নাগরিকত্বের নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাকিমপুর সরুপনগর বাজার ও তেতুলিয়া সীমান্ত এলাকায় চারটি হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল বাংলাদেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অন্তত সাড়ে ৩০০ জনকে।
বিএসএফ সূত্রে জানা যায়, তাদের মধ্যে ১০০ জনকে আজ শুক্রবার বিজিবি-বিএসএফের সমঝোতায় নাগরিকত্বের নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখনও সীমান্ত এলাকায় অপেক্ষারত ও হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন প্রায় নিজেদের বাংলাদেশি দাবি করা আরও প্রায় ৫০০ মানুষ।
সীমান্তে অপেক্ষারত ব্যক্তিদের দাবি, তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে দালাল মারফত ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। ভারতে এসে কেউ গৃহকর্মী, শ্রমিক হিসেবে অবৈধভাবে বসবাস করেছিল। পেতেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের সামাজিক সুরক্ষার সবকিছুই।
অনেকে আবার অবৈধভাবে জোগাড় করেছিলেন ভারতের জাতীয় পরিচয়পত্রও। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া নির্দেশের পর আতঙ্ক গ্রাস করেছে তাদের। তাই পরের দেশে ছেড়ে নিজের দেশে ফিরতে চাইছেন তারা।
গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নথিপত্রহীন অভিবাসীদের যত দ্রুত সম্ভব দেশ ছাড়ার জন্য সতর্ক করেছেন। অন্যথায় তার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, ‘ওরা কি আমাদের শ্বশুরবাড়ির লোক যে তাদের খাবার, পোশাক ওবং ওষুধের খরচ দেশকে (ভারতকে) বহন করতে হবে?’
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আটককৃত কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের আদালতে হাজির না করে নির্বাসনের জন্য সরাসরি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। গত এক বছরে কাগজপত্রবিহীন অভিবাসী সন্দেহে অনেককে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস।
প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে। এই অংশের প্রায় ৬০০ কিলোমিটারজুড়ে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় পাচার, চোরাচালান ইত্যাদির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে।
রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে এই বেড়াবিহীন অংশগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের জন্য বিএসএফ-কে প্রায় ১৪২ একর জমি হস্তান্তর করেছে। ওই জমিতে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও বিএসএফের নতুন আউটপোস্ট (সীমান্ত চৌকি) তৈরি করা হবে।




