logo

বাংলাদেশের পাটে রেকর্ড শুল্ক আরোপ, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ

বাংলাদেশের পাটে রেকর্ড শুল্ক আরোপ, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তীব্র ক্ষোভ
বাংলাদেশি পাটের ওপর ইতিহাসের সর্বোচ্চ অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় ক্ষুব্ধ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

“ভারতের ডায়মন্ড হারবারের ইলিশ যেমন কোনোদিন পদ্মার ইলিশের সমকক্ষ হতে পারবে না, তেমনই ভারতের পাট কখনোই বাংলাদেশের পাটের গুণমানের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারবে না।”— বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাট আমদানিতে ভারত সরকারের রেকর্ড পরিমাণ অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে ঠিক এভাবেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।

তাদের অভিযোগ, দেশীয় পাটকল ও চাষিদের রক্ষা করার নামে এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত থেকে বিদেশে পাটজাত পণ্য রপ্তানি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভারত সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছেন ভারতীয় রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

দেশটির ফেডারেশন অব স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অব ইন্ডিয়া এবং ফাউন্ডার সেক্রেটারি, ভারতীয় অ্যাপেক্স কাউন্সিলর চিরঞ্জীব ঘোষ এ প্রসঙ্গে বলেন- "বাংলাদেশ থেকে পাট না এলে ইউরোপ-আমেরিকায় আমাদের যে বিশাল রপ্তানি বাজার ছিল, তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক্সপোর্ট মার্কেট কার্যত বন্ধ। বাংলাদেশকে আটকানোর জন্য নেপালকেও শুল্কের মুখে ফেলা হলো, যা দিনশেষে বাংলার (পশ্চিমবঙ্গ) শিল্পকেই ধ্বংস করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যা করছেন, এখানেও তাই ঘটছে।"

নভেম্বরে ভারত সফর করতে পারেন তারেক রহমান—ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের পাটের সঙ্গে ভারতীয় পাটের গুণগত মানের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন-- "ভারতে যেটা হয় সেটা 'হোয়াইট জুট' বা সাদা পাট। কিন্তু বাংলাদেশের পাট হলো গোল্ডেন জুট—পুরো রেশমি এবং উচ্চমানের। ভৌগোলিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর কারণেই এই পার্থক্য। পদ্মার ইলিশের সঙ্গে যেমন ডায়মন্ড হারবারের ইলিশের তুলনা হয় না, তেমনই বাংলাদেশের পাটের সঙ্গে ভারতীয় পাটের তুলনা চলে না। দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে চাইলেও রাজনৈতিক ও নীতিগত বাধার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।"

বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ও পাটজাত পণ্যের ব্যবসায়ী প্রলয় ব্রহ্মচারী বলেন, "রাজনীতির শিকার হচ্ছি আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বড় ব্যবসা পোলারাইজড হয়ে গেলেও অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্প ধ্বংসের পথে। আমাদের চাষিরা গাট প্রতি ৪,৭০০ রুপি পেলেও তাদের উৎপাদন খরচই প্রায় ৪,০০০ রুপি। তবে স্থানীয় পাটের মান উন্নত করার চেষ্টা করা হলেও আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের মান পাওয়া অসম্ভব।"

বাংলাদেশের ইলিশ চেয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ

তিনি আরও জানান, আগে এক বাংলা থাকার কারণে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চমানের পাট এনে এখানে গবেষণা ও যৌথ উদ্যোগ ছাড়া ভারতীয় রপ্তানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। সরকারের উচিত এই পলিসিগত বিরোধ মিটিয়ে শিল্পের স্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।

সার্কুলার ও ৯ বছরের ইতিহাস

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (DGFT) একটি সার্কুলার জারি করে জানায়, গত ৯ বছর ধরে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক চালু ছিল, তা বজায় রাখা হচ্ছে। এর শুরুটা হয় ২০১৫ সালে। ওই বছরের অক্টোবরে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা (ডিজিএডি) (বর্তমানে যা ডিজিটিএআর) বাংলাদেশে তৈরি পাট পণ্যের ওপর প্রথম ডাম্পিং তদন্ত শুরু করে। ২০১৭ সালে তদন্ত শেষে বাংলাদেশ ও নেপালের নির্দিষ্ট কিছু পাট পণ্যে প্রথম অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়।

৩০ ডিসেম্বর ২০২২ সালে ৫ বছর মেয়াদ শেষে পর্যালোচনার পর শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৩৫০ ডলার করা হয়। এরপর ৩০ জুন ২০২৫ সালে ‘মিড-টার্ম রিভিউ আবেদনে’ ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইজেএমএ) এবং এপি মেসতা টোয়াইন মিলস অ্যাসোসিয়েশন মেয়াদের আগেই মধ্যবর্তী পর্যালোচনার আবেদন জানায়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর গত ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যালোচনার পর ইতিহাসের সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের মান বিশ্বজুড়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ
বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের মান বিশ্বজুড়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

নতুন সংযোজন ও শুল্কের বিশেষ কাঠামো

আগে ৩টি পণ্যে শুল্ক থাকলেও এবার ৪ নম্বর পণ্য হিসেবে বস্তা বানানোর কাঁচা চট বা কাপড় ( Jute Sacking Cloth) কে যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হতো। এছাড়া অতীতে গণহারে শুল্ক বসালেও এবার নির্দিষ্ট কোম্পানির নাম ধরে ক্যাটাগরিভিত্তিক শুল্ক ধরা হয়েছে:

১. Jute Yarn / Twine (পাটের সুতা)

২. Hessian Fabric (বিশেষ মোড়ক বা কার্পেট জাতীয় কাপড়)

৩. Jute Sacking Bags (খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বস্তা)

৪. Jute Sacking Cloth (নতুন সংযোজন)

বাংলাদেশের আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ এবং নাটোর জুট মিলস -এর মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক হার নির্ধারণ করা ছাড়াও অন্যান্য অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার (প্রায় ৫৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত শুল্ক বসানো হয়েছে। অন্যদিকে, নেপালের পণ্যে প্রতি টনে ২৪৭ ডলার এবং ২৯২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করেছে দেশটি।

ভারতের দাবি, বাংলাদেশে কাঁচামালের দাম সামান্য কমলেও ভারতে অস্বাভাবিক কম দামে তৈরি পাটজাত পণ্য পাঠানো হচ্ছিল। এর ফলে ভারতীয় পাটকলগুলোর মুনাফা হ্রাস পেয়েছে। তাই ভারতের জন্য এ শিল্প রক্ষা করা সামাজিক ও সামাজিকভাবেও জরুরি। ভারতে প্রায় ১১৬টি কম্পোজিট জুট মিল রয়েছে, যার ৮৬টিই পশ্চিমবঙ্গে। দেশটিতে পাট খাতে ৪ লাখের বেশি শ্রমিক এবং ৪০ লাখের বেশি কৃষক পরিবার যুক্ত।

লজিস্টিক ও ভৌগোলিক কড়াকড়ি

এদিকে, ট্যাক্স বৃদ্ধির পাশাপাশি যোগাযোগের পথও কঠিন করা হয়েছে। আগে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ১৫০টির মতো পাটের ট্রাক ভারতে প্রবেশ করলেও ২০১৭ সালের পর তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। নতুন নিয়মে কোনো সীমান্ত স্থলবন্দর দিয়ে পাটের ট্রাক ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

আমদানিকারকদের বাধ্য করা হয়েছে সমুদ্রপথে মুম্বাইয়ের ‘নহাভা শেভা’বন্দর ব্যবহার করতে। এর ফলে শিপিং খরচ ও সময় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটি তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর ভারতের কড়াকড়ির মতোই এক ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বার্তার অংশ বলে মনে করছেন দেশটির বিশ্লেষকরা।