যেভাবে বন্ধু থেকে শত্রু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ গড়িয়েছে আলোচনার টেবিলে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শনিবার (১১ এপ্রিল) দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি এ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। প্রত্যাশা, যুদ্ধবিরতি বা শান্তির বার্তা কখন আসবে, কখন কাটবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এ অস্থিরতা।
তবে এর মধ্যেও গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে, দুই দেশের দীর্ঘ ৪৭ বছরের শত্রুতা আর তীব্র অবিশ্বাসের সম্পর্কের এই আলোচনা কতটুকু সফল হবে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের উত্থান এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান চিরশত্রুতে পরিণত হয়। তবে এর আগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একশ বছরেরও বেশি সময় ছিল এক বন্ধুত্বের গল্প। কীভাবে দুই দেশের মধ্যে এই বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা একটি ধারাবাহিক সময়রেখায় তুলে ধরা হলো—
জিম্মি সংকট দিয়ে বৈরিতার সম্পর্ক শুরু
তখন ইরানের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। ১৯৬৩ সালে তার প্রবর্তিত ‘হোয়াইট রেভোল্যুশন’ সংস্কারের বিরোধিতা করে গ্রেপ্তার হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ওই সময় তাকে প্রথমে ইরাকের নাজাফে নির্বাসনে পাঠানো হয়, পরে ১৯৭৮ সালে ফ্রান্সে।
সেখান থেকে খোমেনি অডিও বার্তা ও বক্তৃতার মাধ্যমে পাহলভিবিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। একসময় তীব্র আন্দোলনের মুখে রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে ফেরেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। এরপর ইরানে গণভোটে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই শত্রুতার বীজ বপন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের প্রায় সাত মাস অতিবাহিত হয়। ওই বছরের ৪ নভেম্বর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ইরানের ছাত্রদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫২ মার্কিন কর্মীকে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত রেজা পাহলভিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এই ঘটনার পর ১৯৮০ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর নয় মাস পর জিম্মিরা মুক্তি পান।
ইরানকে ‘মহা শয়তান’ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ১৯৯৫ সালের ৩০ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযোগে হিজবুল্লাহ, হামাস এবং ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে ইরানি মদদপুষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়।
পরে ২০০২ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একইসঙ্গে ইরান, ইরাক এবং উত্তর কোরিয়াকে সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা ‘মহা শয়তান’ হিসেবে অভিহিত করেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক বাহিনীর আদর্শিক শাখা রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে।
পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান
২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরানের অঘোষিত পরমাণু স্থাপনার তথ্য প্রকাশ পেলে তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা দেখা দেয়। ২০১৫ সালে ছয়টি বিশ্বশক্তির সঙ্গে তেহরানের একটি চুক্তি হয়, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় জারি করা হয় এবং অক্টোবরে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা
২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরানের মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানি ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ড্রোন হামলায় নিহত হন। তিনি ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল-মাহদির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন সোলেইমানি। ইরান এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা
২০২৫ সালের ২১ জুন ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি বড় পারমাণবিক কেন্দ্র নাতাঞ্জ, ফোরদো এবং ইস্পাহানে হামলা চালায়। ট্রাম্প দাবি করেন, কেন্দ্রগুলো ‘বিধ্বস্ত’ হয়ে গেছে। এরপর থেকে ইরানের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চলছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে শেষপর্যন্ত আলোচনার টেবিল থেকে সম্পর্ক গড়াল যুদ্ধের ময়দানে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প হামলার হুমকি দেন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে এবং ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোতে আঘাত হানে। ইরান এর প্রতিশোধ নিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ার পর চলতি মাসের শুরুতে দুই পক্ষ একটি ১৫ দিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শনিবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত চলছে। কোনো সমঝোতায় না পৌঁছালে আগামী ২২ এপ্রিল এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কি শুধু শত্রুতার, নাকি বন্ধুত্বের সম্পর্কও ছিল? ইতিহাস বলে, এই দুই দেশের মধ্যে এক সময় বন্ধুত্বের সম্পর্কও ছিল।
বন্ধুত্বের শুরু ও শেষ
১৮৩৪ সাল থেকে মার্কিন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এ সম্পর্ক স্থায়ী ছিল। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করে। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। তবে মাঝে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বন্ধুত্ব বজায় ছিল।
তারপর ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে রেজা পাহলভির শাসনের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ইরানে মার্কিনবিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।