logo

ইন্দোনেশিয়ার রণতরি কেনার সিদ্ধান্ত কী বার্তা দিচ্ছে এশিয়ায়

ইন্দোনেশিয়ার রণতরি কেনার সিদ্ধান্ত কী বার্তা দিচ্ছে এশিয়ায়

নিজস্ব বিমানবাহী রণতরি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া। ইতালির কাছ থেকে জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি জাহাজটি কিনবে জাকার্তা। ১৯৮৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইতালীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিল জাহাজটি। চলতি বছরের ৫ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বার্ষিকীর আগে জাকার্তায় পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্তমানে থাইল্যান্ডের একটি রণতরি রয়েছে। আর বৃহত্তর এশিয়ায় কেবল চীন, ভারত ও জাপানের নিজস্ব বিমানবাহী রণতরি রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের বহুজাতিক সংবাদ চ্যানেল সিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেশটির কৌশলগত অবস্থান মজবুত করবে। আবার এমনও হতে পারে, এটি মূলত ব্যয়ের দিক থেকে বিলাসী পদক্ষেপ, যার বাস্তব সামরিক লাভ সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ কেনার তদারকি করেন। তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিমানবাহী রণতরি অর্জনের ধারণাটি সামনে আসে।

আবার কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, অসংখ্য কৌশলগত পানিপথ ও বিশ্বের ব্যস্ততম সামুদ্রিক বাধার কিছু নিজের ভূখণ্ডে থাকা এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই ইন্দোনেশিয়ার জন্য একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনার পক্ষে শক্ত যুক্তি তৈরি করে। বিশাল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত দেশটির জন্য সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকেই।

ইন্দোনেশিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (লেসপারসি) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বেনি সুকাদিস বলেন, ‘এই ধরনের জাহাজ বিভিন্ন যুদ্ধ ও যুদ্ধবহির্ভূত অভিযানে সহায়তা করতে পারে।’ তার মতে, শুধু সামরিক অভিযান নয়, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ মিশনেও এমন রণতরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সমালোচকেরা সতর্ক করছেন, বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর উচ্চাভিলাষী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচির কারণে বাজেট আগেই চাপের মধ্যে রয়েছে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার হিসাব অনুযায়ী, একটি বিমানবাহী রণতরির বার্ষিক পরিচালন ব্যয় ৫০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কমপাস নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত মতামতে ইন্দোনেশিয়ার পাজাজারান বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিশেষজ্ঞ জানুস টিএইচ সিয়াহান বলেছেন, জাহাজটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শত শত ক্রু সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে।

তিনি লিখেছেন, জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি বিমানবাহী রণতরিটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। পরিবর্তনকালীন জাহাজের যুদ্ধ কার্যকারিতা কার্যত শূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রতি সেকেন্ডে পূর্ণ গতিতে চলতে থাকবে। এ ছাড়া পুরোনো জাহাজটির পরিষেবা মেয়াদও সীমিত হতে পারে।

কীভাবে জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি ব্যবহার করবে ইন্দোনেশিয়া

বিমানবাহী রণতরি হলো একটি বৃহৎ যুদ্ধজাহাজ যা সামরিক ও নৌশক্তির প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়। এটি সাধারণত একটি বাহক স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ, যার মধ্যে বিমান এবং অন্যান্য জাহাজের একটি এসকর্ট বহর থাকে। জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি রণতরি শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, বিশেষ মিশনেও ব্যবহৃত হয়, যেমন মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ।

ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া অনুযায়ী, ইতালি থেকে জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি বিমানবাহী রণতরি কেনার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া একটি বিদেশি ঋণ প্যাকেজ এবং পরিবহন হেলিকপ্টার ও ক্যারিয়ার-অপ্টিমাইজড ইউটিলিটি হেলিকপ্টার কিনবে। মার্কিন ডলারের হিসাবে এর মোট মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রিকো রিকার্ডো সিরাইত বলেছেন, ‘জাকার্তা ও রোমের মধ্যে জাহাজ সম্পর্কিত আলোচনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান।’ তিনি আরও জানান, এই চুক্তির অধীনে বাতিল জাহাজটিকে কর্মক্ষম করার খরচ বহন করবে ইন্দোনেশিয়া।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রিবিউন নিউজ তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘ইন্দোনেশিয়ান সরকার নৌবাহিনীর অপারেশনাল প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ করবে।’ অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার জন্য এই চুক্তি একটি বৃহৎ বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা একটি শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তুলতে চায়। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্নির্মাণে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

এক-তারকাখচিত এই জেনারেল বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপগ্রেডের পরিধি কতটা হবে, সম্ভাব্য খরচ কত হতে পারে, কিংবা জাহাজটির মূল নির্মাতা ফিনক্যান্টেরিকে সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হবে কিনা এসব বিষয় এখনই বলা যাচ্ছে না।

জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি প্রথম ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিষেবায় প্রবেশ করে। এটি সোমালিয়া, কসোভো, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ায় বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছিল।

bigStoryContent

১৮০ মিটার লম্বা এই জাহাজটি মূলত হেলিকপ্টার এবং হ্যারিয়ার বা এমভি-২২ অস্প্রে’র মতো উল্লম্বভাবে অবতরণ করতে সক্ষম জেট ও প্রোপেলার বিমান পরিচালনার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তবে এতে এফ-১৪ বা জে-১৫টি-এর মতো প্রচলিত ফিক্সড-উইং যুদ্ধবিমানের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাটাপল্ট বা ভারী গ্রেপ্তারকারী সরঞ্জাম নেই।

উল্লম্বভাবে অবতরণ করতে সক্ষম এমন বিমান ইন্দোনেশিয়ার বহরে নেই। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজটির ভূমিকা সীমিত হতে পারে, বিশেষ করে যদি ৪০ বছর পুরোনো এই রণতরিটি চীনের তিনটি বৃহত্তর, আরও উন্নত ও ভারী অস্ত্রসজ্জিত বিমানবাহী জাহাজের মুখোমুখি হয়।

দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশ নিজেদের দাবি করে বেইজিং। ফলে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের বিরোধ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিরোধের পক্ষ না হলেও চীনের তথাকথিত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ নাটুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছে ইন্দোনেশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) কিছু অংশের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে।

লেসপারসির বেনি বলেন, ‘দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের মতো সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে আসছে চীন। অবশ্য তাইওয়ানের দাবি, তারা স্বাধীন ভূখণ্ড। ফলে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজমান। এ ধরনের উত্তেজনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’

থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইএসইএসএস) খাইরুল ফাহমি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডির সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া চাইলে জাহাজটিকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে, যাতে এটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধান অভিযানের জন্য ড্রোন মোতায়েন করতে পারে। সামুদ্রিক সীমান্ত ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবৈধ মাছ ধরা, চোরাচালান বা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন খুব কার্যকর হতে পারে। ড্রোনের মাধ্যমে মারাত্মক পেলোড বহন করাও সম্ভব, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবাহী রণতরি প্রতিরক্ষার জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ এগুলো ধীরগতির ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করা যায় না।

ইন্দোনেশিয়ার এয়ারলাঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আলফিন ফেব্রিয়ান বাসুন্দোরো ও নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো ট্রিস্টান্টো সঞ্জয়া বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা মূলত আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো দূরবর্তী স্থানে শক্তি প্রদর্শন এবং আক্রমণ চালানোর জন্য রণতরি ব্যবহার করে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স প্রকাশিত নিবন্ধে দুই বিশ্লেষকের বলেন, ‘একটি বিমানবাহী রণতরি ধীরগতির ও তুলনামূলকভাবে বড় জাহাজ, ফলে এটি শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো কাল্পনিক সামরিক হামলার পরিস্থিতিতে একটি বিমানবাহী রণতরি সম্পদের চেয়ে বরং বড় দায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

প্রাথমিক লক্ষ্য ও এশিয়ায় বার্তা

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মুহাম্মদ আলী ৬ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভাব্যভাবে কিনতে চাওয়া বিমানবাহী রণতরিটি শুরুতে মানবিক মিশনের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। সিন্দো নিউজ তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, ‘মনে হচ্ছে যুদ্ধবিহীন সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য আমাদের একটি ক্যারিয়ার প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, জাহাজটি দুর্যোগপীড়িত এলাকায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পরিবহন করতে পারবে এবং এর পরিসর প্রায় ৭ হাজার নটিক্যাল মাইল (১৩ হাজার কিলোমিটার)। ভৌগোলিকভাবে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব থেকে পশ্চিমে ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত। ফলে দূরপাল্লার নৌ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

bigStoryContent

বর্তমানে দুর্যোগ ত্রাণের জন্য ইন্দোনেশিয়া পাঁচটি ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ডক (এলপিডি) জাহাজের ওপর নির্ভর করে। প্রতিটি জাহাজ ৫০০ জনের বেশি মানুষ এবং কয়েক ডজন যানবাহন বহনে সক্ষম। এসব উভচর জাহাজে হেলিকপ্টার অবতরণের ডেকও রয়েছে। এগুলোর গতি সর্বোচ্চ ১৬ নট, (গ্যারিবাল্ডির প্রায় অর্ধেক) তবে এদের অপারেশনাল রেঞ্জ ১০ হাজার নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত।

১৯৯৭ সালে পরিষেবায় যুক্ত হওয়ার পর থেকে থাইল্যান্ড প্রায়ই তাদের বিমানবাহী জাহাজ চাক্রি নারুবেতকে মানবিক সহায়তা মিশনে ব্যবহার করেছে। এমন অভিযানে জাহাজটি ভাসমান হাসপাতাল ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। সর্বশেষ গত নভেম্বরে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে ভয়াবহ বন্যার সময় জাহাজটি মোতায়েন করা হয়, যেখানে ২৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়।

তবে আবুধাবির রাবদান সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিফেন্স ইনস্টিটিউটের গবেষক আব্দুল রহমান ইয়াকুব মনে করেন, গ্যারিবাল্ডি বা চাক্রি নারুবেতের মতো বিমানবাহী রণতরি দুর্যোগ ত্রাণের জন্য আদর্শ নয়। তিনি ১৩ জানুয়ারি দ্য ডিপ্লোম্যাটে লিখেছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন গতি, নমনীয়তা, অগভীর পানিতে প্রবেশের সক্ষমতা এবং উপকূলে সরাসরি কর্মী, প্রকৌশল সরঞ্জাম, চিকিৎসা সুবিধা ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা।

তিনি আরও বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া যদি একটি বিমানবাহী জাহাজ কেনে, প্রতিবেশী ও বহিরাগত শক্তিগুলো এটিকে কেবল দুর্যোগ-ত্রাণের হাতিয়ার হিসেবে দেখবে না, বরং সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করবে। ইতোমধ্যেই নৌ আধুনিকীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে সংবেদনশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি নতুন কৌশলগত বার্তা বহন করতে পারে।’

অন্যদিকে, আইএসইএসএসের খাইরুল ফাহমি মনে করেন না যে এই জাহাজ কেনা সামুদ্রিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেবে। তার যুক্তি, জাহাজটি প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো, আধুনিক ক্যারিয়ারের তুলনায় সীমিত সক্ষমতা সম্পন্ন এবং সর্বশেষ প্রজন্মের জেট ফাইটারের উপযোগী নয়। তাই তার বিশ্বাস, গ্যারিবাল্ডি কেনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বড়ভাবে বিঘ্নিত করবে না।

ব্যয়

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি যুদ্ধবিমান ডেক থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডির পরিণতিও থাইল্যান্ডের চাক্রি নারুবেতের মতো হতে পারে। থাই ক্যারিয়ারটি মাঝে মাঝে মানবিক সহায়তা মিশনে ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগ সময় চোনবুরি প্রদেশের সাত্তাহিপ নৌঘাঁটিতে নোঙর করে থাকে।

৩৩৬ মিলিয়ন ডলারের এই থাই বিমানবাহী রণতরি কম ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যয়। ২০২১ সালে ফোর্বস জানায়, জাহাজটির ডিজেল-গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রায় ৫০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে। এতে শত শত নাবিকের খাবার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।

bigStoryContent

প্রথমদিকে ক্যারিয়ার থেকে পরিচালিত নয়টি হ্যারিয়ার জেটের রক্ষণাবেক্ষণও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। কারণ খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে সেগুলো বাতিল করা হয়।

গ্যারিবাল্ডি পরিচালনাও কম ব্যয়সাপেক্ষ নয়। ২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটো মিশনের সময় ইতালীয় নৌবাহিনী এই জাহাজ মোতায়েনে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় করেছিল বলে জানা যায়।

আইএসইএসএসের ফাহমি বলেন, ‘একটি ক্যারিয়ার পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি যুদ্ধ মিশনে জাহাজটি সচল রাখতে অন্তত ৫০০ জন কর্মী প্রয়োজন, আর বিমান অভিযান চালাতে লাগে আরও প্রায় ২৫০ জন। এ ছাড়া আক্রমণের ঝুঁকি ও সরবরাহ সহায়তার প্রয়োজনের কারণে ক্যারিয়ারের সঙ্গে সবসময় দুই থেকে চারটি এসকর্ট জাহাজ রাখতে হয়।’

তবে লেসপারসির বেনি মনে করেন, ইন্দোনেশিয়ার সম্ভাব্য ক্যারিয়ারটি থাইল্যান্ডের মতো ভাগ্য বরণ করবে না। ১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়ার জন্য এমন জাহাজ কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নিজের বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল রক্ষায় ইন্দোনেশিয়ার গ্যারিবাল্ডির মতো একটি ক্যারিয়ার বেশি প্রয়োজন।

ফাহমি আরও বলেন, ‘সম্পূর্ণ নতুন একটি বিমানবাহী রণতরি তৈরি করার চেয়ে গ্যারিবাল্ডি কেনা ইন্দোনেশিয়ার জন্য বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। ছোট পরিসরে শুরু করলে প্রাথমিক খরচ কম থাকবে এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ মিলবে।’

তার মতে, এই জাহাজ ইন্দোনেশিয়ান নৌবাহিনীকে ডেক ক্রু ও পাইলট প্রশিক্ষণ দিতে এবং ক্যারিয়ার পরিচালনার লজিস্টিক ও রক্ষণাবেক্ষণ চাহিদা বোঝার সুযোগ দেবে, যা ভবিষ্যতে বড় ও আধুনিক জাহাজে যাওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। সতর্কভাবে পরিচালিত হলে এটি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনীর ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।