স্যাটেলাইট ছবি থেকে নেপালের ভূমিধসের কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ হড়কা বান ও ভূমিধসের কারণ খুঁজতে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করেছেন ভূবিজ্ঞানীরা। প্রাথমিক বিশ্লেষণে তারা বলছেন, তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি পাহাড়ের বিশাল একটি অংশও ধসে পড়েছিল। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি সরু পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে ভয়াবহ হড়কা বানের সৃষ্টি করে।
বুধবারের দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক ও তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
ভূ-প্রকৃতিবিদ ক্রিস্টেন কুক ও ড্যান শুগার স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে জানান, বুধবার তোলা ছবিগুলো মেঘ ও ধ্বংসাবশেষের ধুলায় স্পষ্ট ছিল না। তবে এতে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার বিষয়টি দেখা যাচ্ছিল।
বৃহস্পতিবারের তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ছবিতে তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখতে পান। তাদের মতে, শুধু হিমবাহের বরফ নয়, এর নিচের পাহাড়ের মূল শিলাস্তরের একটি বড় অংশও ধসে পড়েছিল। এতে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও শিলাখণ্ড একসঙ্গে নিচের উপত্যকায় নেমে আসে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ড্যান শুগার বলেন, ছবিতে দেখা যাচ্ছে হিমবাহের পাশাপাশি পাহাড়ের অনেক বড় একটি অংশও ধসে পড়েছে। অর্থাৎ পাহাড়ের শিলাস্তরের বড় ধরনের ধসের সঙ্গে হিমবাহের একটি অংশও নিচে নেমে আসে।
ধসে পড়া বরফ ও পাথর উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার পরও এর গতি কমেনি। ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি গ্রেনোবল আল্পসের গবেষক ক্রিস্টেন কুক বলেন, বরফ গলতে থাকায় সেই ধ্বংসাবশেষ খাড়া ও সরু উপত্যকা দিয়ে প্রবল বেগে নিচের দিকে এগিয়ে যায়। কয়েক তলা ভবনের সমান উচ্চতার পানি ও কাদার স্রোত তখন আশপাশের জনপদগুলোতে আছড়ে পড়ে।
হড়কা বানের আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে নেপালের ত্রিশূলী নদীর ব্যাপক পরিবর্তনও দেখতে পেয়েছেন গবেষকেরা।
কোলপুরতার, বেত্রাবতী ও স্যাপ্রু বেসি এলাকার ছবিতে দেখা গেছে, বন্যার পর ত্রিশূলী নদী আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশস্ত হয়েছে। কোথাও নদীর পানি তীর উপচে পড়েছে, আবার কোথাও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে নদীর গতিপথ ও আকৃতি বদলে গেছে।
পানির রংও বদলে গেছে। আগে যেখানে পানি কিছুটা সবুজাভ দেখা যেত, এখন সেখানে বাদামি ও কালচে রং দেখা যাচ্ছে। গবেষক কুকের মতে, পানিতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পলি মিশে যাওয়ায় এমন পরিবর্তন হয়েছে।
নদীর তীরবর্তী বহু শহর ও গ্রাম ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়েছে। বেত্রাবতী এলাকার স্যাটেলাইট ছবিতে কোথাও কোথাও কাদার স্তরের মধ্য থেকে কয়েকটি বাড়ির অংশ বেরিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা স্যাপ্রু বেসিতেও ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। লাংটাং ট্রেকের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় বহু স্থাপনা পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। পাশের একটি শাখা নদীও আগের তুলনায় প্রশস্ত হয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে পানির চাপ উজানের দিকেও প্রভাব ফেলেছিল বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের পর্বতভূগোলবিদ অ্যালটন বায়ার্স বলেছেন, হড়কা বানটির পর বিশাল একটি জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির এই চিত্র কাটিয়ে উঠতে বহু বছর সময় লাগতে পারে।
নেপালে দীর্ঘদিন ধরে হিমবাহ ও পাহাড়ি দুর্যোগ নিয়ে গবেষণা করা বায়ার্সের মতে, তিনি এর আগে এত বড় হিমবাহজনিত বন্যা দেখেননি।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও এবারের দুর্যোগের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার কারণে হিমবাহ ও পারমাফ্রস্ট—অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মাটি ও বরফ—গলে যাচ্ছে। এতে উচ্চভূমির পাথর, মাটি, বরফ ও হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমে যাচ্ছে।
এর ফলে পাহাড়ের ওপর বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়ে একের পর এক ধস ও বরফ ভেঙে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করেন বায়ার্স।
তবে এবারের ঘটনাটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছাতে চান না গবেষক কুক ও শুগার।
কুক বলেন, পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়া ও ভূমিধস স্বাভাবিকভাবেও ঘটতে পারে। তবে উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে পারমাফ্রস্ট গলার কারণে পাহাড়ের ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।



