ফি মওকুফ হলেও শর্ত মেনে পাড়ি দিতে হবে হরমুজ

বিশ্বের অন্যতম সংর্কীণ ও আলোচিত নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজের কাছে কোনো ফি না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এই সুযোগ আগামী ৬০ দিন বহাল থাকবে। তবে কৌশলগত এই জলপথ পাড়ি দিতে হলে মানতে হবে ইরানের নবগঠিত ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ (পিজিএসএ)-এর আরোপিত নতুন শর্ত।
শুক্রবার (১৯ জুন) আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্টের হাতে আসা পিজিএসএর একটি শর্তাবলিসংক্রান্ত নথি থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
নথি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ৬০ দিন কোনো ফি নেবে না ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে জাহাজ মালিকদের পিজিএসএ কর্তৃক অনুমোদিত বিমা গ্রহণ করতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক। যদিও এই বিমাটি প্রাথমিকভাবে বিনামূল্যে দেওয়া হবে।
তেহরানের নতুন এই পদক্ষেপটি মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকটিকে (এমওইউ) কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা। ওই সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের জন্য ‘বিনা খরচে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল।
ইরান আপাতত এই বাধ্যতামূলক বিমার জন্য কোনো ফি বা চার্জ নিচ্ছে না এবং এর সমস্ত খরচ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেই বহন করছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে এই বিমার ওপর নির্দিষ্ট ফি বা চার্জ আরোপ করা হতে পারে।
পিজিএসএ ভবিষ্যতে এই বিমা ফি চালু করার পূর্ণ অধিকার সংরক্ষণ করে, যা কার্যকর হলে জাহাজ মালিকদের নিয়ম মেনে ফি দিয়ে বিমা ক্রয় ও নবায়ন করতে হবে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থায় (আইএমও) জমা দেওয়া ও সামুদ্রিক শিল্পখাতে প্রচারিত এই শর্তাবলি মূলত হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকীর্ণ নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে স্পষ্ট চেষ্টা।
বর্তমানে ওমান উপকূলের কাছে মার্কিন-সুরক্ষিত দক্ষিণ করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজের সংখ্যা বাড়লেও, ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ‘শুধুমাত্র লারাক দ্বীপের নিকটবর্তী নির্ধারিত পথেই যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে।’ এর মাধ্যমে তারা মূলত তাদের নিজেদের পছন্দের উত্তর চ্যানেলটি ব্যবহার করতেই আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে বাধ্য করছে।
নিয়ম না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
পিজিএসএ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত নৌপথ থেকে যে কোনো ধরনের বিচ্যুতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং তা নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, এখন থেকে ট্রানজিট আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমতিপত্র জারির একমাত্র দায়িত্ব তাদেরই। নিয়ম অমান্য করা হলে তারা জরিমানা আরোপ, যাতায়াতের অনুমতি বাতিল বা আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে এই সামগ্রিক বিষয়ে মেরিটাইম নিউজ পোর্টাল ‘লয়েডস লিস্ট’ পিজিএসএ-এর কাছে মতামত চাইলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ওমান উপকূলের দক্ষিণ পথ ব্যবহারকারী বেশ কয়েকজন ট্যাংকার মালিকের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, খুব কম সংখ্যক মানুষই বিশ্বাস করেন যে ইরানের এই শর্তাবলি জাহাজ চলাচলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই কাঠামো তৈরি করতে পারবে।
বর্তমানে ওই প্রণালি ছেড়ে যাওয়া একটি প্রধান ট্যাংকার কোম্পানির মালিক পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত জটিল ও ‘পাগলামি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অথচ, গত বুধবার স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের জন্য সম্পূর্ণ টোলমুক্ত যাতায়াতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সেইসঙ্গে এতে একটি রূপরেখা ছিল, যার মাধ্যমে ইরান ও ওমান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে প্রণালিটি পরিচালনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবে।
বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি, মধ্যপ্রাচ্যের (এমইজি) মিত্র দেশগুলো ও প্রধান তেল কোম্পানিগুলো বারবার সতর্ক করে বলেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে যে কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি আরোপ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজও সতর্ক করেছেন, এই ধরনের চার্জ আরোপের অনুমতি দিলে তা বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত জলপথের জন্যও একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। তবে তিনি পিজিএসএর নথিটি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার জোরালোভাবে বলেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালি ‘প্রথম ৬০ দিন ও তার পরেও সম্পূর্ণ টোলমুক্ত থাকবে। পরবর্তীতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য টোল আরোপ ঠেকাতে ওয়াশিংটন সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না- জানতে চাইলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে ‘আন্তর্জাতিক জলপথ সর্বদা টোলমুক্ত হওয়া উচিত’।
তবে ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেন, আপাতত প্রণালিটি ‘সম্পূর্ণ খোলা রাখাই’ তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেন, এই সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে ওমানি, ইরানি ও উপসাগরীয় উপকূলীয় জোট ভবিষ্যতে প্রণালিটির জন্য সম্মিলিতভাবে একটি উপযুক্ত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করবে, যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আর কখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়।

