ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে অটল ইরান, আপত্তি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের

পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর প্রথম দফার আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী সপ্তাহেই নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা বলেছেন।
তবে ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা নমনীয় হলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল। ঘনিষ্ট মিত্র ইসরায়েলের আপত্তিতে আবার সায় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তেহরানের পর একসঙ্গে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে চাপ বাড়াতে চায় ওয়াশিংটন।
ইরানের বক্তব্য স্পষ্ট; তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিজেদের প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। আর ইসরায়েল হুমকি হিসেবে দেখছে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ওমানের মধ্যস্থতায় শুক্রবারের আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ‘কোনো আলোচনা হয়নি’। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তাহলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা করবে।
তিনি বলেন, মাস্কাটে আলোচনা সরাসরি না হলেও ‘মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ হয়েছিল’। তার ভাষ্য, আলোচনা ছিল ‘শুভসূচনা’, তবে ‘আস্থা তৈরি করতে এখনো অনেক পথ বাকি’।
ইরানের রাজধানী তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে আশাবাদ তেমন দেখা যায়নি। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক নারী আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আগের মতো এবারও আলোচনা ফল ছাড়াই শেষ হবে। কারণ, দুপক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়।’
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আব্দুল্লাহ আল-শায়জি জানান, তিনি দুই শত্রুরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন চুক্তির আশা করেন, তবে খুব একটা আশাবাদী নন।
কাতারের রাজধানী দোহায় আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘কঠোর অবস্থানে’ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের ‘প্রভাবে ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়াতে চাইছে’। বিশেষ করে গত মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ওয়াশিংটন মনে করছে, ইরান এখন ‘দুর্বল’।
‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’
শুক্রবার আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বললেও ট্রাম্প শনিবার থেকে কার্যকর একটি নির্বাহী আদেশে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর ‘শুল্ক আরোপের’ ঘোষণা দেন। পাশাপাশি, ইরানের তেল রপ্তানি কমাতে নতুন করে বেশ কয়েকটি শিপিং প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি ছিল চীনের সঙ্গে। সে বছর চীন থেকে ইরান ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে এবং রপ্তানি করে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
আরাঘচি বলেছেন, পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ইরানের ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ এবং এই কর্মসূচি ‘চলতেই থাকবে’। তিনি বলেন, ‘আমরা আশ্বাস পেলে চুক্তিতে যেতে প্রস্তুত। ইরানের পারমাণবিক সংকট শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।’ তার মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘প্রতিরক্ষার বিষয়’, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই আলোচনার বিষয় হতে পারে না।
আল-শায়জি বলেন, ইরান যেমন কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়, যুক্তরাষ্ট্রও তেমনি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পক্ষে দুই পক্ষকে কাছাকাছি আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এই প্রথম আবার আলোচনা হলো। সেই সময় ইসরায়েলের নজিরবিহীন বোমা হামলার পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাত টানা ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ট্রাম্পের হুমকি আরও জোরালো হয়। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিণ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপ পায়ায় পেন্টাগন।
ওমানের আলোচনায় ওয়াশিংটনের পক্ষে উপিস্থি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। শনিবার আরব সাগরে অবস্থানরত ওই যুদ্ধজাহাজ পরিদর্শন করেন তারা। এক্স হ্যান্ডেলে উইটকফ লেখেন, এই যুদ্ধজাহাজ ও এর বহর যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখছে। ট্রাম্পের ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ বার্তাকে বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, গত মঙ্গলবার একটি ইরানি ড্রোন রণতরীর কাছে আসলে সেটিকে ভূপাতিত করা হয়। এ কাজে নিয়োজিত যুদ্ধবিমানের পাইলটের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে।
তবে আব্দুল্লাহ আল-শায়জি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এভাবে সামরিক চাপ ধরে রাখা সম্ভব নয়। তার মতে, দীর্ঘদিন সেনাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে তার কার্যালয় জানিয়েছে। সেখানে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। নেতানিয়াহুর মতে, যেকোনো আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল। সবশেষে আরাঘচি আশা প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘হুমকি ও চাপের’ পথ থেকে সরে আসবে, যাতে ‘আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়’।