ওপেক থেকে কেন বেরিয়ে গেল আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী ১ মে থেকে পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন (ওপেক) ও বৃহত্তর ওপেক+ জোট থেকে বেরিয়ে যাবে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদক্ষেপটি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যদিও বিশ্লেষকরা এর ব্যাপক বাজারগত প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করছেন।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমন্বিত তেল উৎপাদন নীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় ছয় দশকের অংশগ্রহণের অবসান ঘটল। দেশটি ১৯৬৭ সালে আবুধাবির মাধ্যমে ওপেকে যোগদান করে ও ১৯৭১ সালে ফেডারেশন গঠিত হওয়ার পরেও এর সদস্য ছিল।
দেশটি সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো উৎপাদকদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনে অবদান রাখত, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ডাব্লিউএএম জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাজারের চাহিদা মেটাতে নমনীয়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে উৎপাদন নীতি ও সক্ষমতা পর্যালোচনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’
ঐতিহাসিকভাবে ওপেক ও ওপেক+ উৎপাদন কোটার মাধ্যমে সরবরাহ সমন্বয় করে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ায় দেশটি এই চুক্তিগুলো থেকে বাদ পড়েছে, ফলে এটি স্বাধীনভাবে উৎপাদন নির্ধারণ করতে পারবে।
দেশটি উৎপাদন বৃদ্ধি খাতে বিনিয়োগের সহায়তায় ২০২৭ সালের মধ্যে উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি মন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল-মাজরুয়ি বলেছেন, জাতীয় জ্বালানি কৌশল পর্যালোচনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি রয়টার্সকে বলেন, এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত, উৎপাদনের মাত্রা সম্পর্কিত বর্তমান ও ভবিষ্যত নীতিগুলো সতর্কভাবে পর্যালোচনার পরেই এটি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বিষয়টি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে উত্থাপন করেনি।
ভেবেচিন্তে নেওয়া
সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল মাজরুয়ি বলেন, নীতির ‘অত্যন্ত সতর্ক ও দীর্ঘ পর্যালোচনার’ পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকার সিদ্ধান্তটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আমরা সঠিক সময়ে ও সঠিক গতিতে বাজারের পরিস্থিতি অর্জন করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, বিঘ্ন ন্যূনতম রাখার জন্যই এই সময়টি বেছে নেওয়া হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি যে বিশ্বে বর্তমানে সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে, এবং এই সময়ে আমাদের সরে আসাটাই সঠিক সময়, কারণ এর ফলে দামের উপর ন্যূনতম প্রভাব পড়বে।
সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই সময়ের সঙ্গে নৌচলাচলের সীমাবদ্ধতার যোগসূত্র স্থাপন করেন। তিনি বলেন, সময়টা সঠিক, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও সীমিত থাকায় এটি বাজার এবং দামের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলবে না। তিনি এই পদক্ষেপকে একটি ‘সার্বভৌম জাতীয় সিদ্ধান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তি মন্ত্রী এবং অ্যাডনকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সুলতান আল জাবের বলেছেন, এই সিদ্ধান্তটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল এবং বাজার স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সার্বভৌম দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।
সরবরাহে বিঘ্ন
বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই সময়কাল নীতিগত পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি উভয়কেই প্রতিফলিত করে।
স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে এবং উৎপাদন কোটার সেই কঠোর বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে এই তেলসমৃদ্ধ দেশটিকে হতাশ করে রেখেছিল।
তিনি বলেন, স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে, বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতের অতিরিক্ত ব্যারেল শোষণ করতে সক্ষম হবে। উৎপাদকরা যদি বাজারের অংশকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এই পদক্ষেপটি বাজার পরিচালনায় ওপেক-এর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সাম্প্রতিক তথ্য থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন বিঘ্নের কারণে সরবরাহ থেকে দৈনিক ৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ব্যারেল কমে যাওয়ায় মার্চ মাসে ওপেক-এর উৎপাদন ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দৈনিক ২০ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।