logo
এনবিসির প্রতিবেদন

সৌদির আপত্তিতে মাঝপথে স্থগিত ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’

সৌদির আপত্তিতে মাঝপথে স্থগিত ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আগাম আলোচনা না করে তড়িঘড়ি করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান হিসেবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব। রিয়াদ এই অভিযানে তাদের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশপথ ব্যবহারের সুবিধা স্থগিত করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে প্রজেক্ট ফ্রিডম মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মাথায় বন্ধ করতে বাধ্য হন ট্রাম্প।

সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম এনবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প যখন তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ উদ্ধার অভিযানের ঘোষণা দেন, তখন সৌদি ও অন্যান্য মিত্ররা এতে চরম অসন্তুষ্ট হন।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রিয়াদ জানায়, তাদের কাছে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক বিমান ওড়াতে পারবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলোকে সৌদি আকাশপথও ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা এনবিসিকে জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে আলাপ হয়, তবে এতেও সংকট নিরসন হয়নি। শেষ পর্যন্ত সৌদির গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ ব্যবহারের সুবিধা ফিরে পেতে ট্রাম্প প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হন।

একজন সৌদি কর্মকর্তা এনবিসিকে জানান, ট্রাম্প ও ক্রাউন প্রিন্স নিয়মিত যোগাযোগে আছেন। সৌদি কর্মকর্তারা ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর ঘোষণা সৌদি নেতাদের অবাক করেছে কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এই ধারণার সমস্যা হলো এ সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত এবং রিয়েল টাইমে ঘটছে। সৌদি আরব যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তির মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল সৌদি আরব নয়, কাতার ও ওমানের মতো মিত্র দেশগুলোও ট্রাম্পের এই আকস্মিক অভিযানের সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছে। ওমানের এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আগে অভিযান ঘোষণা করেছে এবং পরে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। যদিও হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, মিত্রদের আগেভাগেই জানানো হয়েছিল, তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ট্রাম্প কাতারের আমিরের সঙ্গেও কথা বলেছেন, তবে অভিযান শুরু হওয়ার পরে।

হরমুজে ইরানি অবরোধ ভাঙার উপায় হিসেবে রোববার (৩ মে) রাতে ট্রাম্প এই অভিযানের ঘোষণা দেন। মঙ্গলবার (৫ মে) যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ে এই পদক্ষেপ জোরদারে অনেক কথা বলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এটি শুরু করার মাত্র ৩৬ ঘণ্টা পরে আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেন।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, অভিযান বন্ধ করার সময় সামরিক বাহিনী প্রণালি দিয়ে আরও বেশ কয়েকটি জাহাজ সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর আগে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছিল, প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর অংশ হিসেবে দুটি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ ইতোমধ্যে প্রণালি অতিক্রম করেছে। এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো চুক্তি সই করা যায় কি না তা দেখার জন্য অভিযানটি অল্প সময়ের জন্য স্থগিত করা হবে।

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান (রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট) এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সৌদিরা ইরান যুদ্ধের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল।

মার্কিন কর্মকর্তা এনবিসি-কে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ওই অঞ্চলের আকাশপথ ব্যবহারের জন্য মিত্রদের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে কোনো বিকল্প পথ নেই। প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর অধীনে জাহাজগুলোকে রক্ষা করার জন্য সামরিক বিমানগুলো অপরিহার্য ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অন্য দেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতিকে এবিও (এক্সেস, বেসিং এবং ওভারফ্লাইট) বলে অভিহিত করে। যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং সহায়তা প্রদানকারী বিমান—সবগুলোর জন্য এই অঞ্চলের মিত্রদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। নিজেদের ভূখণ্ডে বিমান মোতায়েনের জন্য সৌদি আরব ও জর্ডান অপরিহার্য। আকাশপথ ব্যবহারের জন্য কুয়েত এবং আকাশপথ ও সামুদ্রিক লজিস্টিকের জন্য ওমান অপরিহার্য।

প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প কাতারের আমিরের সঙ্গে কথা বলেন। কাতারের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমির আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চল এবং এর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এই অঞ্চলে তাদের অবস্থান এখন ২৮ ফেব্রুয়ারির চেয়েও বড়। বর্তমানে অঞ্চলটিতে দুটি ইউএস ক্যারিয়ার স্ট্রাইক মোতায়েন করা হয়েছে। পেন্টাগনও লজিস্টিক ও সহায়তা ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।

প্রজেক্ট ফ্রিডম-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক নজরদারি, অগ্নিনির্বাপক ক্ষমতা ও জাহাজকর্মী মোতায়েন করেছিল।

ইরানও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোতে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিল। পেন্টাগন কর্মকর্তারা জানায়, অভিযানটি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ থেকে আলাদা ছিল।