ইরানে ট্রাম্পের সহজ যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন আসলে কতটা সহজ

ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল থেকে দুদিন ধরে চলমান ব্যাপক হামলায় এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তা এবং কয়েকশ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশটিতে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, তারা কোনো চুক্তি আদায়ের জন্য সামরিক চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং তারা ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চায়। দেশদুটি ধরেই নিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত ইরানে একটি সহজ জয় অর্জন করবে। কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থা ও কাঠামো পরিবর্তনের ইচ্ছা আক্ষরিক অর্থে কতটা বাস্তবসম্মত তাই বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক জাসিম আল-আজাওয়ি।
আলজাজিরায় প্রকাশিত একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে জাসিম আল-আজাওয়ি বলেছেন, ‘এই হামলা এবং ইরানের দ্রুত পাল্টা জবাব, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তারই বহিঃপ্রকাশ। মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছিলেন এবং আগামী সপ্তাহে আবার বৈঠকের কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, বাস্তবে এ কূটনীতি সফল হওয়ার কথা ছিল না, কেননা যুদ্ধের পরিকল্পনাকে আড়াল করতেই তা ব্যবহৃত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হামলার সময় নির্বাচন থেকেই ধারণা করা যায়, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, পারস্যে ইহুদিদের গণহত্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার বাইবেলীয় কাহিনি স্মরণে পালিত পুরিম উৎসবের আগে হামলা চালাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই ইরানে বিজয় ঘোষণা করতে আগ্রহী—কিন্তু বাস্তবে তা অর্জন করা যাবে কিনা, তা অনিশ্চিত।’
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, বড় আঘাতে যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি ঘটানো যাবে। তাদের হামলায় খামেনিসহ জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কমান্ডার), সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েল তাদের নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে চাচ্ছে যে, তারা ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর ও হিসাবকৃত। এবার তা হয়নি। ইরানি সশস্ত্র বাহিনী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা হামলা চালায়। ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি হাইফা, তেল আবিব, ইলাতসহ ইসরায়েলের শহরগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। জাসিম আল-আজাওয়ি লিখেছেন, ‘এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত করে, ইরান হামলার আশঙ্কা আগে থেকেই করেছিল এবং পাল্টা পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছিল। এখন প্রশ্ন হলো, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তা কতটা স্থায়ী থাকবে, আর ইরান তা অতিক্রম করতে পারবে কিনা।’
অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি
আরেকটি বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে মার্কিন জনমনে খুব একটা উৎসাহ নেই। ইউগভ ও দ্য ইকোনমিস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক জরিপে সমর্থন নেমে এসেছে ২১ শতাংশে। ফলে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং ইরান শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ না করলে, ট্রাম্প দ্বিধায় পড়বেন—সংঘাত বাড়িয়ে দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, নাকি পিছু হটে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হওয়া।
আর এর মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্য এক ধরনের পরীক্ষায় পরিণত হবে। সংঘাত প্রত্যাশামতো না এগোলে তা রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে, এমনকি সৃষ্টি হতে পারে অভিশংসনের চাপ।
কিন্তু কোনো বিশ্লেষকই মনে করেন না, এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী হবে। ১২ দিনের যুদ্ধ যেখানে যুদ্ধবিরতিতে শেষ হয়েছিল, বর্তমান সংঘাত সেখানে আরও বিস্তৃত ও গভীর আকার নিয়েছে। এমনকি খামেনির মৃত্যুর পরও অঞ্চলজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলার প্রস্তুতি দেখায় তারা আপসের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।
গতকাল ইরানে হামলার ঘোষণা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত আকাশপথে অভিযান চালাবে, স্থলসেনা মোতায়েন করবে না। পাশাপাশি তিনি ইরানের জনগণকে উদ্দেশ করে বলেছেন, তারা যেন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়। এই আহ্বান এমন সময়ে এসেছে, যখন মাত্র দুই মাস আগে ইরানজুড়ে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ হয়েছিল। তখন সরকার কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়ে হাজারো মানুষ হত্যা করে। এই মুহূর্তে একই মাত্রার আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের সম্ভাবনা কম।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলমান হামলা অব্যাহত রাখতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে সাংবাদিক জাসিম আল-আজাওয়ি মনে করেন, হামলাগুলো সফল হলেও তা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত করবে না।
তিনি বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের জেনারেলরা হয়তো পরামর্শ দিতে পারেন যে—দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত টেকসই নয়, যেমনটা গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে দেখা গিয়েছিল। তাছাড়া ট্রাম্প পুরনো কৌশলেও খেলতে পারেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজয় ঘোষণা করে দিয়ে যুদ্ধ শেষ করা।’
এক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা কীভাবে শুরু হবে? কেননা, আলোচনার আড়ালে দুইবার প্রতারিত হওয়ার পর তেহরান এবার আরও কঠোর অবস্থান নেবে। আর যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকেই যায়, তাহলে মার্কিন আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে তারা নতুন করে ছাড় আদায় করে নিতে পারে। সেই হিসাবে, আজকের কূটনৈতিক ভাঙন ভবিষ্যতে ইরানের জন্য আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আলজাজিরায় প্রকাশিত ‘দি ফ্যান্টাসি অফ অ্যান ইজি ভিক্টরি ইন দ্য ওয়ার অফ ইরান’ শীর্ষক মতামত প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।