logo

ইরানে যুদ্ধ থেকে কীভাবে লাভবান হতে পারে রাশিয়া

ইরানে যুদ্ধ থেকে কীভাবে লাভবান হতে পারে রাশিয়া

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে মস্কোতে। রাশিয়ার কট্টরপন্থি একটি পক্ষের দাবি, বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া একই ধরনের হামলার শিকার হতে পারে। পশ্চিমা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে ‘বেপরোয়া’ মন্তব্যকে তারা এর প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। তবে ইরানে হামলা মস্কোর জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও এটিকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের—বিশেষ করে ইউক্রেন আক্রমণের এক ধরনের যৌক্তিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ক্রেমলিন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বকে একটি অসংযত ও বেপরোয়া শক্তি হিসেবে বর্ণনা করে আসছে; ইরানের ঘটনা সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করেছে বলে তাদের ধারণা।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইরানে মার্কিন হামলা ২০১১ সালের লিবিয়ার ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। সে বছর ন্যাটো নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে রাশিয়ার বিরত থাকার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, যা পরে পুতিনের পুনরায় প্রেসিডেন্ট পদে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

২০১১ সালের অক্টোবরে বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফির হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা নেতারা তখন ঘটনাটি উদ্‌যাপন করলেও লিবিয়ায় গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা আসেনি বরং দেশটি গৃহযুদ্ধ এবং বিভক্তির দিকে ধাবিত হয়।

পুতিনের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা—পশ্চিমা ‘গণতন্ত্রীকরণ অভিযানের’ কাছে নতি স্বীকার করলে ব্যক্তিগতভাবে তার এবং রাশিয়ার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হতে পারে। 
২০১১ সালের ডিসেম্বরে মস্কোয় নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে পশ্চিমাপন্থি নগরবাসীর বিক্ষোভ ক্রেমলিনকে আরও সতর্ক করে তোলে। ২০১২ সালের মে মাসে শপথ গ্রহণের আগে পুতিন সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেন। এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল, যার ধারাবাহিকতায় দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের ময়দান বিপ্লবে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ঘটে।

বর্তমানে ইরানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পুতিন হয়তো মনে করছেন, ইউক্রেনে তার পদক্ষেপ যথাযথ ছিল। একই সঙ্গে তিনি সোভিয়েত আমলে গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের প্রতিও কৃতজ্ঞ, যা রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

ইউক্রেন আক্রমণের সূচনা সত্ত্বেও পুতিন নিজেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একজন রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও বেপরোয়া আচরণই সেই ব্যবস্থার অবক্ষয়ের কারণ।

১৯৩০-এর দশকের সোভিয়েত সামরিক নীতিতে ‘যুদ্ধকে শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ার’ ধারণা প্রচলিত ছিল। ২০০৭ সালে ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখানোর পর সেগুলোকে রাশিয়া শত্রু ভূখণ্ড হিসেবে দেখতে শুরু করে। ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে সেই ধারণা প্রথমবারের মতো প্রয়োগ করা হয়।

২০১৪ সালে ইউক্রেনে হামলা এবং ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে ক্রেমলিন এমন সামরিক হস্তক্ষেপের আগাম প্রতিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যেগুলোর শিকার হয়েছিল ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া এবং এখন ইরান।

ইউক্রেনকে পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার ফলে রাশিয়ার অধিকাংশ জনগণ সরাসরি যুদ্ধের প্রভাব থেকে দূরে থেকেছে। যুদ্ধকে সমাজে ‘অনিবার্য’ হিসেবে উপস্থাপন করতেও সফল হয়েছে ক্রেমলিন।

ঐতিহাসিকভাবে জটিল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার এক অপ্রত্যাশিত মিত্রে পরিণত হয় ইরান। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুর দিকে, যখন অনেকে মনে করছিলেন ইউক্রেন তুরস্কের বায়রাক্তার ড্রোনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবে, তখন রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে ইরান। তবে এই সহযোগিতা নিঃস্বার্থ ছিল না। তেহরান এর জন্য বিপুল অর্থ পেয়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করেছে।

তবুও রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক এতটা গভীর নয় যে, এখন মস্কো সরাসরি ইরানের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। উপরন্তু, ইসরায়েলের সঙ্গে রাশিয়ার এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা রয়েছে। ইসরায়েল ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র দেয়নি বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায়ও যোগ দেয়নি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করায় রুশ ধনকুবেরদের জন্যও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে ইসরায়েল।

আরেকটি কারণ হলো—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিষয়ে তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা। মস্কো চায় না ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভেঙে দিক বা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করুক।

বাস্তবিক অর্থে ইরানকে বড় ধরনের সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও রাশিয়ার সে অর্থে নেই। ইউক্রেন যুদ্ধে অর্জিত সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা ছাড়া তাদের বিকল্প কম, যা করলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাছাড়া ইরানের পক্ষে সেই সহায়তার মূল্য পরিশোধ করাও কঠিন হতে পারে।

স্বল্পমেয়াদে মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাও বয়ে আনছে। যুদ্ধের ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে, যা রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে পারে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য ইউক্রেনের প্রধান অর্থদাতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্যও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয় করবে, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে, যেগুলো ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে ইউক্রেন নিয়ে চলমান আলোচনায় মস্কোর কৌশলগত অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারে।

এছাড়া দেশীয় রাজনীতিতেও লাভবান হতে পারেন পুতিন। ইরানে ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতার দৃশ্য রাশিয়ার জনগণের মধ্যে পুতিনের প্রতি সমর্থন তৈরি করতে পারে। কেননা, এই পরিস্থিতি পুতিনকে ‘স্বৈরশাসক হলেও জাতির রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেবে।
 

লেখক: লিওনিদ রাগোজিন

আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]