logo

ইলেকট্রনিক অস্ত্রের দৌড়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির নতুন সমীকরণ

ইলেকট্রনিক অস্ত্রের দৌড়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির নতুন সমীকরণ

কোনো বিস্ফোরণের শব্দ নেই, ধোঁয়া নেই, আকাশে যুদ্ধবিমানও নেই—তবু হঠাৎ থেমে গেল বিমানবন্দর, নিভে গেল শহরের বিদ্যুৎ, বন্ধ হয়ে গেল সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা। আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় এমন দৃশ্য আর কল্পকাহিনি বা সিনেমার দৃশ্য নয়, বরং দ্রুত এগিয়ে আসা বাস্তবতা। ২০২৬ সালে এসে যুদ্ধক্ষেত্র এখন শুধু মিসাইল বা ট্যাংক নয়, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অদৃশ্য সিগন্যালই হয়ে উঠছে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (ইএমপি), হাইপাওয়ার মাইক্রোওয়েভ (এইচপিএম) এবং কগনিটিভ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (সিইডব্লিউ) প্রযুক্তি যুদ্ধের চরিত্র আমূল বদলে দিচ্ছে। একটি সুনির্দিষ্ট ইএমপি আঘাত বড় কোনো শহর বা সামরিক ঘাঁটির কাছে ঘটলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উড়োজাহাজ ভূপাতিত হওয়া থেকে শুরু করে রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়া—সবই সম্ভব এবং সেটিও কোনো দৃশ্যমান ধ্বংসাবশেষ ছাড়াই। আর এই লড়াইয়েই অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে চীন—যা স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম নিয়ন্ত্রণে বিপুল বিনিয়োগ বাড়িয়েছে—স্যাটেলাইট জ্যামিং প্রযুক্তি, নৌবাহিনীর ইলেকট্রনিক আক্রমণ ইউনিট এবং ড্রোনবিরোধী সিস্টেমে তাদের অগ্রগতি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বেইজিংয়ের কৌশল এখন শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং শত্রুর সেন্সর, রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা যুদ্ধ শুরুর আগেই অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। ফলে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগেই কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার এক নতুন সামরিক দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

‘ক্যাচ–আপ’ অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড বাজেটারি অ্যাসেসমেন্টস ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ‘ক্যাচ–আপ’ অবস্থানে রয়েছে এবং এই ব্যবধান পুষিয়ে নিতে ‘এক দশক বা তারও বেশি সময়’ লাগতে পারে। যদিও প্রতিবেদনটি কয়েক বছর আগের, সাম্প্রতিক সামরিক বিশ্লেষণগুলো দেখাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র এখনও পূর্ণমাত্রায় এআইনির্ভর ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। মার্কিন কংগ্রেসে উপস্থাপিত একাধিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ইতোমধ্যে এমন সক্ষমতা অর্জন করেছে যা চাইলেই প্রতিপক্ষের সিগন্যাল শনাক্ত, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে।

ইলেকট্রনিক যুদ্ধের এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আধুনিক সামরিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, শুধু শক্তিশালী অস্ত্র নয়—দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই ভবিষ্যতের যুদ্ধ নির্ধারণ করবে। সেন্সর, স্যাটেলাইট ও ড্রোন থেকে আসা বিপুল ডেটা মানুষের পক্ষে একা সামলানো সম্ভব নয় বলেই এআইকে ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রের ‘সহ–কমান্ডার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মার্কিন মেরিন কর্নেল ড্রু কুকর এক প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে বলেন, ‘মানুষ ও কম্পিউটার একসঙ্গে কাজ করলে অস্ত্রব্যবস্থার লক্ষ্য শনাক্ত করার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।’

তার মতে, এআইনির্ভর যুদ্ধ কেবল গতি নয়, সিদ্ধান্তের ধরনও বদলে দিচ্ছে—যেখানে মিলিসেকেন্ডের সিদ্ধান্তই কৌশলগত জয়-পরাজয় নির্ধারণ করতে পারে।

নতুন প্রজন্মের অস্ত্র: লিওনিডাস

এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বিনিয়োগও বাড়িয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এপিরাসের তৈরি ‘লিওনিডাস’ নামের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম ইতোমধ্যে সামরিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অস্ত্র প্রচলিত গোলাবারুদের মতো নয়; একটি শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ পালস ছুড়ে ড্রোনের ঝাঁক একসঙ্গে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি ব্যয়সাশ্রয়ী এবং বিস্ফোরণ বা ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকিও নেই।

লিওনিডাস সিস্টেম

তবে নতুন প্রযুক্তি এলেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। মার্কিন বিমানবাহিনীর ৩৫০তম স্পেকট্রাম ওয়ারফেয়ার উইংয়ের কমান্ডার কর্নেল ল্যারি ফেনার জুনিয়র এক সম্মেলনে স্বীকার করেন, ‘আমরা এখনও পুরোপুরি সেখানে পৌঁছাইনি। যদি এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্বাভাবিক সিগন্যাল শনাক্ত করতে পারে, সেটাই হবে গেম চেঞ্জার।’

গোপন অস্ত্র, অদৃশ্য হামলা

তবে এর ঝুঁকি অনেক বেশি জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও। ইলেকট্রনিক অস্ত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা—এগুলো সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়। একটি সাধারণ ট্রাক, কনটেইনার জাহাজ বা রেলকারের ভেতরেও স্থাপন করা সম্ভব এইচপিএম বা ইএমপি ডিভাইস। সম্প্রতি ব্রিটেন এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে, যা সাধারণ শিপিং কনটেইনারের ভেতর লুকিয়ে রাখা যায়—ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধাস্ত্র আর চোখে ধরা পড়বে না, বরং ছড়িয়ে থাকবে বেসামরিক পরিবহনের আড়ালে।

এই প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ শুধু রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, বাণিজ্যিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতেও উন্নত ইলেকট্রনিক অস্ত্র পৌঁছে দিতে পারে। ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান পরিচালনায় যেখানে বিশাল লজিস্টিক প্রয়োজন, একটি ছোট ইএমপি ডিভাইস চালাতে লাগে তুলনামূলক কম দক্ষতা, যা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং দায়ী পক্ষ শনাক্ত করাও কঠিন করে তোলে।

প্রতিরোধের দৌড়

এই অদৃশ্য হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ বিকিরণ–সহনশীল ইলেকট্রনিকস, এআইচালিত প্রতিরক্ষা অ্যালগরিদম এবং কোয়ান্টাম এনক্রিপশনের মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তবু ইতিহাস বলছে, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রায়ই আক্রমণাত্মক উদ্ভাবনের পেছনে পড়ে থাকে—যে ব্যবধানই ভবিষ্যতের কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণ করতে পারে।

ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও বেসামরিক ঝুঁকি

ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রভাব কেবল সামরিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়—এটি সরাসরি জড়িয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বেসামরিক নিরাপত্তার সঙ্গে। একটি বড় শহরের বিদ্যুৎ গ্রিড কয়েক মিনিটের জন্যও অচল হলে ব্যাংকিং লেনদেন, হাসপাতালের জরুরি সেবা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল এমনকি পানির সরবরাহ পর্যন্ত ব্যাহত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইএমপি বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ আক্রমণের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর “ডিনায়েবিলিটি”—অর্থাৎ হামলাকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হওয়া। এতে রাষ্ট্রগুলোর জন্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হয়ে পড়ে এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে।

একই সঙ্গে বেসামরিক প্রযুক্তি ও সামরিক প্রযুক্তির সীমারেখাও দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ স্মার্টফোনে ছবি চিনতে সাহায্য করছে, সেটিই আগামীকাল যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এখন শুধু অস্ত্রের নয়, বরং ডেটা, অ্যালগরিদম এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের নিয়ন্ত্রণের লড়াই। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “যে দেশ তরঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে তারাই কৌশলগত সুবিধা পাবে।”

ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো প্রথম গুলিটাই ছোঁড়া হবে না—প্রথম আঘাত আসবে অদৃশ্য তরঙ্গে।

তথ্যসূত্র : পপুলার মেকানিক্স, মিসাইল থ্রেট