ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পরও একটি চীনা কারখানা যেভাবে টিকে আছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত উচ্চ শুল্কের লক্ষ্য ছিল চীনা উৎপাদন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। কিন্তু একটি চীনা ইলেকট্রনিকস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০২৫ সালের অস্থির সময়টি একটি বিশেষ উপলব্ধির মধ্য দিয়ে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে -যদি পরিস্থিতি খুব বেশি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন না হয়, তবে চীনের উৎপাদন সক্ষমতার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ কারণে তারা এ বিষয়টিকে ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
অ্যাজিলিয়ান টেকনোলজি যারা মূলত পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পণ্য তৈরি করে, তাদের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। শুল্ক যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস তাদের মার্কিন অর্ডারগুলো বন্ধ ছিল এবং গ্রাহকরা চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার চাপ দিচ্ছিল। গত বছর চীনের অফিসিয়াল পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স সংকুচিত হওয়ায় অনেক কোম্পানি বিশৃঙ্খলার মুখে পড়ে। তবে বেইজিংয়ের পাল্টা ব্যবস্থা—খনিজ ও ধাতব পদার্থের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—শুল্ক কমাতে সাহায্য করে। মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে চীনের উৎপাদন খাতে আবার গতি ফিরে আসে।
অ্যাজিলিয়ানের সিইও ফ্যাবিয়েন গাউসোর্গস জানান, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। তবে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিক মারো বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত অনুসারে ট্রাম্পের শুল্ক চীনের উৎপাদন খাতের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেনি, বরং এটি বাণিজ্য সংযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে পুনর্গঠিত করেছে।’ ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি
২০২৪ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনি জনপ্রিয়তার সময় থেকেই অ্যাজিলিয়ানের গ্রাহকরা শুল্ক এড়াতে আগাম পণ্য মজুত করতে শুরু করে। ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর আতঙ্কিত গ্রাহকদের ফোন আসতে থাকে। অনেকে মালয়েশিয়া বা ভারতে কারখানা সরানোর তাগিদ দেন। অ্যাজিলিয়ান ভারতে একটি শাখা খুললেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির কারণে গ্রাহকরা সেখানে কাজ করতে অনাগ্রহ দেখান। গাউসোর্গস বলেন, ‘ভারতে সময় বেশি লাগে; একটি অফিসিয়াল কোম্পানি খুলতেই আমাদের এক বছর লেগেছে।’
শুল্কের আঘাত ও বিকল্পের সন্ধান
ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে অনেক গ্রাহক অর্ডার বাতিল করে দেন। চীনের ডংগুয়ানে অবস্থিত ১২ হাজার বর্গমিটারের কারখানায় পণ্যের স্তূপ জমে যায়। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের শুল্ক ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
অস্থিতিশীলতা এড়াতে অ্যাজিলিয়ান মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে অংশীদার খুঁজে নেয় এবং ভারতের ধারওয়াদে জায়গা খোঁজে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সরানোর চিন্তাও করা হয়েছিল, কিন্তু সেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল অপূর্ণ এবং শ্রমের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
বিকল্প পরিকল্পনার ব্যর্থতা ও চীনের গুরুত্ব
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে চীনের ওপর থেকে বেশিরভাগ শুল্ক সরিয়ে নেওয়া হয়। ঠিক সেই সময়েই ট্রাম্প ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, যাতে তারা রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে। এর ফলে ভারতের বিকল্প পরিকল্পনাটিও হোঁচট খায়। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ায় উৎপাদন শুরু করতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চীনের তুলনায় সবকিছুতে অনেক বেশি সময় লাগছে।
শুল্ক হ্রাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়। এরপর থেকে অ্যাজিলিয়ানের গ্রাহকরা আবার অর্ডার দিতে শুরু করে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় অর্ধে কোম্পানিটির উৎপাদন আগের তুলনায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
গাউসোর্গস এবং তার সহকর্মীরা এখন ভারত আর মালয়েশিয়ার কারখানাকে কেবল একটি 'বিমা নীতি' বা ব্যাকআপ হিসেবে দেখছেন। চীনা যন্ত্রাংশের কম খরচ এবং উন্নত মান ডংগুয়ানের ভিত্তিকে অপরিহার্য করে তুলেছে। যদিও সামনের দিনগুলোতে ট্রাম্পের নীতি বা নতুন কোনো যুদ্ধ নিয়ে তাদের মনে শঙ্কা রয়েছে, তবুও আগামী তিন বছরে তারা তাদের আয়ের ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করছেন।