logo

সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদন/হামের ভয়াবহ রূপ কেমন হতে পারে, তা দেখাচ্ছে বাংলাদেশ

সায়েন্টিফিক আমেরিকানে
সায়েন্টিফিক আমেরিকানে
হামের ভয়াবহ রূপ কেমন হতে পারে, তা দেখাচ্ছে বাংলাদেশ
হামে আক্রান্ত শিশুকে কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশে হামের বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। টিকাদানের অতীত সাফল্য সত্ত্বেও দেশটিতে হাম এখন এমন এক প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে, যা ২০০৫ সালের পর আর দেখা যায়নি।

হাম সাধারণত ভাইরাসজনিত একটি রোগ। এতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠার পাশাপাশি সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তবে এটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে নিউমোনিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৪৪ জনের। আক্রান্ত ও মৃতদের সিংহভাগই দুই বছরের কম বয়সি শিশু, যাদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে; বিশেষ করে প্রান্তিক ও গ্রামাঞ্চলের বহু তথ্যই পরিসংখ্যানে আসেনি।

টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক শাকিল ফয়জুল্লাহর মতে, এই ভাইরাস কারও প্রতি কোনো দয়া দেখায় না। তিনি বলেন, ‘টিকা কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি দেখা দিলেই ভাইরাসটি জেঁকে বসে। আর বাংলাদেশে ঠিক এটিই ঘটেছে।’

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১০০ থেকে ৩০০–এর মধ্যে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অস্বাভাবিক বড় বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক ড. জেনিফার নুজো। তিনি জানান, টিকাদানের হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের যে কোনো জনসংখ্যাকে হামের সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হয়, যাকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলা হয়। এতে যেসব শিশু বয়সের কারণে টিকা পাওয়ার উপযোগী হয়নি, তারাও পরোক্ষভাবে সুরক্ষা পায়। কিন্তু হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় টিকাদানের হারে সামান্য পতন ঘটলেও তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

যেভাবে এলো ছন্দপতন

কয়েক দশক ধরে টিকাদানে বিশ্বের রোল মডেল বা ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। সত্তরের দশকে শুরু হওয়া জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

২০১৯ সালেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা নেওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ছিল ৯৩ শতাংশ। দেশ যখন হাম নির্মূলের পথে, তখনই ঘটে ছন্দপতন।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়ে। এরপর ২০২৪ সালে টিকা ব্যবস্থাপনা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে দীর্ঘদিনের টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় রদবদল হওয়ায় টিকার মজুতে টান পড়ে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

একই সঙ্গে অস্থিরতার কারণে বাড়তি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডির তহবিল কমে যাওয়ার কারণেও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও টিকা সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর ফলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের হিসাবে, প্রায় চার লাখ শিশু তাদের প্রয়োজনীয় সব ডোজ পায়নি এবং ৭০ হাজার শিশু একটিও টিকা পায়নি। এই টিকাহীন পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয় অপুষ্টি, শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ—যা মিলেমিশে তৈরি করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।

বাংলাদেশ বনাম যুক্তরাষ্ট্র: সংকটের ভিন্নতা

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা মেক্সিকোর মতো দেশেও সম্প্রতি হামের বিস্তার ঘটছে। তবে বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্রের এই সংকটের কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শাকিল ফয়জুল্লাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে মূল সংকট তৈরি হয়েছে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের সাময়িক ব্যাঘাতের কারণে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রে সংকট তৈরি হয়েছে মানুষের টিকা নেওয়ার অনিচ্ছা (ভ্যাকসিন হেসিটেন্সি) বা কুসংস্কারের কারণে।’

ড. জেনিফার নুজো যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে কেউ চাইলেই টিকা পেতে পারেন। ফলে বাংলাদেশে যা ঘটছে, তার সঙ্গে টিকা বিরোধিতার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফল। সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে একটি বড় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যার ফলে সংক্রমণ কিছুটা ধীর হতে শুরু করেছে।