পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তারকা প্রার্থীদের ছড়াছড়ি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, ক্রীড়াবিদসহ কয়েকজন তারকাকে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সাফল্য পেয়েছিল রাজনীতিতে আনকোরা এই মুখগুলো। স্বাভাবিক কারণেই ল্যান্ডস্লাইড জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস। ৩৪ বছরে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল সরকার।
এরপর মমতা ব্যানার্জির দেখানো পথেই হাঁটতে শুরু করে বিজেপি এবং বামদলগুলোর সম্মিলিত জোট বামফ্রন্ট। বিধানসভা কিংবা লোকসভার নির্বাচন—রাজনীতিতে সেলিব্রিটি প্রার্থীদের যোগদান ক্রমশ বাড়তে থাকে। যদিও সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে বিনোদন জগতের ব্যক্তিরা। দীপক (দেব) অধিকারী, তাপস পাল, শতাব্দী রায়, মুনমুন সেন, শত্রুঘ্ন সিনহা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হিরণ চ্যাটার্জি, জুন মালিয়া, সায়নী ঘোষসহ একের পর এক সেলিব্রিটি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
সেই ধারা এখনও অব্যাহত। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি বিজেপিও একাধিক সেলিব্রিটিকে প্রার্থী করেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বামদলগুলো।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় বিনোদন দুনিয়া থেকে জায়গা পেয়েছেন সোনারপুর কেন্দ্রে অভিনেত্রী লাভলী মৈত্র, চৌরঙ্গী কেন্দ্রে অভিনেত্রী নয়না ব্যানার্জি, বরানগর কেন্দ্রে অভিনেত্রী সায়ন্তিকা ব্যানার্জি, মানিকতলা কেন্দ্রে অভিনেত্রী শ্রেয়া পান্ডে, করিমপুর কেন্দ্রে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী ও ব্যারাকপুর কেন্দ্রে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী।
এ ছাড়াও তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন রাজারহাট গোপালপুর কেন্দ্রে সংগীতশিল্পী অদিতি মুন্সি, চন্দননগর কেন্দ্রে সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন, তুফানগঞ্জ কেন্দ্রে সাবেক ক্রিকেটার শিব শংকর পাল, সপ্তগ্রাম কেন্দ্রে সাবেক ফুটবলার বিদেশ বসু প্রমুখ।
আসন্ন নির্বাচনে একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রার্থী করেছে বিজেপিও। তারকা প্রার্থীদের মধ্যে শিবপুর কেন্দ্রে রুদ্রনীল ঘোষ, শ্যামপুর কেন্দ্রে হিরণ চ্যাটার্জি, যাদবপুর কেন্দ্রে অভিনেত্রী শর্বরী মুখার্জী, টালিগঞ্জ কেন্দ্রে অভিনেত্রী পাপিয়া দে অধিকারী ও সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে অভিনেত্রী রূপা গাঙ্গুলী। সংগীতশিল্পী অসীম সরকার। তিনি লড়ছেন হরিণঘাটা কেন্দ্র থেকে, ময়না কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার অশোক দিন্দা।
ব্যারাকপুরের তৃণমূল প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী জানান, ‘মানুষ কাজের নিরিখেই ভোট দেয়। কাজের নিরিখে মানুষ এখানকার সরকারকে নির্বাচিত করবে। প্রার্থীকে যে পেশা থেকেই নিয়ে আসা হোক না কেন, বাংলার মানুষ ঠিক করে ফেলেছেন তারা তৃণমূলকে ভোট দেবেন, তৃণমূলের সরকার হবে এবং চতুর্থবারের মতো মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করবেন।’
বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী এবং সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমার মনে হয় তারা যে পেশায় ছিলেন, সেই পেশায় রোজগার কমে গেছে, তাই বিকল্প পেশা হিসেবে রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন। প্রথমে তারা আসেননি কেন তা জানি না। কিন্তু, রাজনীতিও একটা খেলার ময়দান। এ খেলায় যদি অন্য জগতের খেলোয়াড়রাও আসে, তবে খেলা আরও জমে উঠবে।’
পানিহাটি কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত মনে করেন, ‘তৃণমূল বা বিজেপির যেই প্রার্থী হোক না কেন, এরা মানুষের জন্য কোনো কাজ করেনি। এটা গত ১০-১৫ বছরে প্রমাণ হয়েছে। ফলে কে গুরুত্বপূর্ণ সেটা বড় কথা নয়, মানুষের জন্য কি কাজ হচ্ছে—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ না হলে, পাঁচ বছর পর সেই মানুষই বিক্ষোভে ফেটে পড়বেন।’
ইতোমধ্যেই নির্বাচনি ময়দানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই তারকা প্রার্থীরা। তবে বছরের অন্য সময়গুলোতে এই তারকা প্রার্থীদের জনসমক্ষে দেখা না গেলেও, নির্বাচনের এই কয়েকটা দিন তারা সাধারণ মানুষ হয়ে যান। ভোটারদের মন জয় করতে এরাই রোদে পুড়ে, বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দরজায় দরজায় ভোট চান। প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেন। তখন মনে মনে ক্ষোভ থাকলেও তারকা প্রার্থীদের কাছে পেয়ে সব ক্ষোভ ভুলে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন ভোটাররাও। তারকা প্রার্থীদের সান্নিধ্যে আসা, হাতে হাত মেলানো, ছবি তোলা, সেলফি তোলা কোনকিছুই অপূর্ণ থাকে না। এভাবেই হয়তো প্রাথমিক জয়টা পেয়ে যান তারকা প্রার্থীরা। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এই বিভিন্ন পেশার তারকাদের নিজদের দলের প্রার্থী করে চলেছে রাজনৈতিক দলগুলো।