logo

অভিবাসন এজেন্টদের গুলিতে মিনিয়াপলিসে মার্কিন নাগরিক নিহত

অভিবাসন এজেন্টদের গুলিতে মিনিয়াপলিসে মার্কিন নাগরিক নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপলিসে অভিবাসন এজেন্টদের গুলিতে এক মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তীব্র বিক্ষোভ ও স্থানীয় নেতাদের কড়া নিন্দা শুরু হয়েছে। চলতি মাসে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) ঘটনাটিকে ‘আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, এক ব্যক্তি হাতে বন্দুক নিয়ে এগিয়ে এলে সেটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গেলে এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান।

তবে ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা এবং রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।

ভিডিওতে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তি— ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেট্টির হাতে বন্দুক নয়, একটি মোবাইল ফোন ছিল। তিনি ফেডারেল এজেন্টদের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যাওয়া অন্য বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন।

ভিডিওর শুরুতে দেখা যায়, এক ফেডারেল এজেন্ট একজন নারীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন এবং আরেকজনকে মাটিতে ফেলে দেন। প্রেট্টি তখন ওই এজেন্ট ও নারীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েন। তিনি নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন এবং মুখ ফিরিয়ে নেন। ঠিক তখনই এজেন্ট তার ওপর পেপার স্প্রে ছিটান।

এরপর প্রেট্টি মাটিতে পড়ে যাওয়া এক নারীকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। এজেন্ট তখনও তার ওপর স্প্রে করতে থাকেন। প্রেট্টি যখন ওই নারীকে তুলতে যান, তখন এক এজেন্ট তাকে টেনে আলাদা করে ফেলে দেন। একাধিক এজেন্ট তাকে ঘিরে ধরে জোর করে হাত ও হাঁটুর ওপর বসিয়ে দেন। এ সময় এক এজেন্ট প্রেট্টির কোমরের পেছন দিক থেকে একটি বস্তু বের করে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যান।

এর কিছুক্ষণ পরই এক কর্মকর্তা প্রেট্টির পিঠের দিকে বন্দুক তাক করে খুব দ্রুত পরপর চারটি গুলি ছোড়েন। এরপর আরও কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। দেখা যায়, আরেকজন এজেন্টও সম্ভবত গুলি চালান।

গুলির পর প্রথমে সব এজেন্টই প্রেট্টির নিথর দেহ থেকে সরে যান। পরে কয়েকজন এজেন্ট তাকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন, আর অন্যরা আশপাশের মানুষদের দূরে সরিয়ে রাখেন।

আইসিইউ নার্স হিসেবে কর্মরত প্রেট্টির মৃত্যুর ঘটনায় শত শত মানুষ ওই এলাকায় জড়ো হয়ে সশস্ত্র ও মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের মুখোমুখি হন। এ সময় এজেন্টরা টিয়ার গ্যাস ও ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড ব্যবহার করেন। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি ও সান ফ্রান্সিসকোসহ আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এই ঘটনা রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। এর আগে ৭ জানুয়ারি আরেক মার্কিন নাগরিক রেনে গুড গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে মিনেসোটা প্রশাসন ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তদন্তে স্থানীয় কর্মকর্তাদের অংশ নিতে দিচ্ছে না।

নিহত ব্যক্তি বৈধ অস্ত্রধারী, দাবি পুলিশের

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার নিহত ব্যক্তি একটি অভিবাসন অভিযানের সময় এজেন্টদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, প্রেট্টি আদৌ তার অস্ত্র বের করেছিলেন কি না।

ফেডারেল কর্মকর্তারা সামাজিক মাধ্যমে একটি বন্দুকের ছবি প্রকাশ করেছেন, যা তাদের দাবি অনুযায়ী প্রেট্টির কাছে ছিল।

ক্রিস্টি নোম বলেন, তিনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে আসেননি। তিনি সহিংসতা ছড়াতে এসেছিলেন।

তবে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজসহ স্থানীয় নেতারা এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ওয়ালজ বলেন, আমি বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করা ভিডিও দেখেছি। এটা সত্যিই বীভৎস। এই তদন্ত পরিচালনার জন্য ফেডারেল সরকারের ওপর ভরসা করা যায় না—রাজ্যই তদন্ত করবে।

মিনেসোটা ব্যুরো অব ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশনের প্রধান ড্রু ইভান্স জানান, শনিবার ফেডারেল এজেন্টরা তার দলের তদন্ত শুরু করার চেষ্টায় বাধা দেন।

মিনিয়াপলিস পুলিশের প্রধান ব্রায়ান ও’হারা বলেন, নিহত ব্যক্তি একজন বৈধ অস্ত্রধারী ছিলেন এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

বিক্ষোভ চলাকালে পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের পুলিশ ও রাজ্যের নিরাপত্তবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। ফেডারেল এজেন্টরা এলাকা ছাড়ার পর শনিবার রাতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, যদিও বিক্ষোভকারীরা আরও কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করেন।

ব্রায়ান ও’হারা সংযমের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দয়া করে আমাদের শহর ধ্বংস করবেন না।

নিরাপত্তা উদ্বেগে মিনিয়াপলিস ইনস্টিটিউট অব আর্টস সেদিন বন্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে এনবিএ মিনেসোটা টিম্বারওলভসের একটি ম্যাচ স্থগিত করা হয়।

অভিযান বন্ধের আহ্বান মেয়র ও গভর্নরের

গভর্নর ওয়ালজ ও অন্যান্য রাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের স্থানীয় অভিবাসন অভিযান অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান। মিনিয়াপলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, এই অভিযান বন্ধ করতে আর কত বাসিন্দা, কত আমেরিকানকে মরতে হবে বা গুরুতর আহত হতে হবে?

এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, মেয়র ও গভর্নর তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ, বিপজ্জনক ও অহংকারী বক্তব্য দিয়ে বিদ্রোহ উসকে দিচ্ছেন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেন— স্থানীয় নেতারা অভিবাসন এজেন্টদের সহায়তায় স্থানীয় পুলিশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এর জবাবে ওয়ালজ বলেন, এই অভিবাসন দমন অভিযান স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

শনিবারের গুলিকাণ্ডের এক দিন আগেই তীব্র শীত উপেক্ষা করে ১০ হাজারের বেশি মানুষ এই অভিযানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। এ ঘটনার আগেই কয়েকটি ঘটনায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে- রেনে গুডের নিহত হওয়া, এক মার্কিন নাগরিককে শর্টস পরা অবস্থায় নিজ বাড়ি থেকে আটক করা এবং পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুসহ স্কুলপড়ুয়া শিশুদের আটক করার ঘটনা।