logo

ইরানে হামলা চালাতে অত্যাধুনিক যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে হামলা চালাতে অত্যাধুনিক যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র তার বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে, যা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত।

পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে বিমান, ড্রোন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। উড়ন্ত ট্যাংকারের মাধ্যমে আকাশে জ্বালানি নেওয়া থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ—সব মিলিয়ে এক বিশাল সামরিক কাঠামো মোতায়েন করা হয়েছে এই অঞ্চলে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এখন পর্যন্ত এই অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। চলুন সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

বি-২ বোমারু বিমান

মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও অন্যতম হাতিয়ার হলো এই বি-২ বোমারু বিমান। প্রতিটি বিমানের দাম এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। চারটি জেট ইঞ্জিনচালিত এই উড়োজাহাজটি পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম। আন্তঃমহাদেশীয় পাল্লার এই বিমানের আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সুবিধাও আছে। মাত্র দুজন পাইলট এটি পরিচালনা করতে পারেন।

গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় মিসৌরির হোয়াইটম্যান এয়ারফোর্স বেস থেকে উড়ে এসেছিল এই বি-২ গুলো। ওই সময় ৩৪ ঘণ্টার অভিযানে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা ফেলা হয়েছিল।

সেন্টকম জানিয়েছে, এবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় তারা ব্যবহার করেছে দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা।

লুকাস ড্রোন

প্রথমবারের যুদ্ধক্ষেত্রে লুকাস ড্রোন ব্যবহার করল মার্কিন বাহিনী। গত বছর মধ্যপ্রাচ্যে ‘টাস্ক ফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক’ নামে একটি ড্রোন ইউনিট গঠন করা হয়। সস্তা ও কার্যকরী এই ড্রোন মূলত ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আদলে বানানো। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এই শাহেদ ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে।

প্রথমবারের যুদ্ধক্ষেত্রে লুকাস ড্রোন ব্যবহার করল মার্কিন বাহিনী।

সেন্টকম এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছে, ‘ইরানের শাহেদ ড্রোনের আদলে তৈরি এই সস্তা ড্রোন এখন মার্কিন বাহিনী কাজে লাগাচ্ছে।’

মার্কিন রণতরি

ইরানে হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি—ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড মোতায়েন করা হয়েছে। লিংকন ছিল আরব সাগরে আর ফোর্ড ছিল ইসরায়েলের উপকূলের কাছে ভূমধ্যসাগরে।

সেন্টকম এফ/এ-১৮ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ওঠানামার ভিডিও প্রকাশ করেছে। এছাড়া গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র টমাহক নিক্ষেপের দৃশ্যও দেখা গেছে ভিডিওতে।

মার্কিন বিমানবাহী রণতরি

আরলেই বার্ক-শ্রেণির এই ডেস্ট্রয়ার জাহাজগুলো প্রতিটি ৯৬টি টমাহক বহন করতে পারে। এগুলোর ‘ইজিস’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে, যা যুদ্ধজাহাজ ও উপকূলীয় স্থাপনা রক্ষায় ব্যবহার করা হয়।

প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ইরানের ছোঁড়া ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ব্যবহার করা হচ্ছে প্যাট্রিয়ট ও থাড (টার্মিনাল হাই-অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কতগুলো ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করা হয়েছে তা জানায়নি সেন্টকম।

তবে ইরান হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করায় এই ইন্টারসেপ্টরের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। গত বছর ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ ও ইউক্রেনে পাঠানো সহায়তার পর মজুত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিমান

এফ-১৬, এফ/এ-১৮, এফ-২২, এফ-৩৫-সহ নানা ধরনের যুদ্ধবিমান এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে। নৌবাহিনী ও মেরিন সেনার পাশাপাশি বিমানবাহিনীর জেটগুলোর নির্দিষ্ট কোনো মিশনের কথা জানায়নি সেন্টকম। টুইন ইঞ্জিনের এ-১০ অ্যাটাক জেটও মোতায়েন করা হয়েছে।

ইএ-১৮জি ইলেকট্রনিক অ্যাটাক বিমান

এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি এই বিমান শত্রুর ইলেকট্রনিক হুমকি শনাক্ত ও দমন করতে জ্যামিং প্রযুক্তি ও রাডার ব্যবহার করে। রাডার ও কমিউনিকেশন সেন্টারের মতো ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশন লক্ষ্য করে নিক্ষেপযোগী ক্ষেপণাস্ত্রও বহন করতে পারে এই জেট।

এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফট (অ্যাওয়াকস)

মার্কিন বাহিনী দুই ধরনের অ্যাওয়াকস ব্যবহার করে—বিমানবাহিনীর ই-৩ সেন্ট্রি ও নৌবাহিনীর ই-২ হক আই। বোয়িং ৭০৭-এর আদলে তৈরি চার ইঞ্জিনের এই জেটে ফিউজলেজ থেকে ১১ ফুট উঁচুতে একটি গোলাকার রাডার ডোম বসানো থাকে।

ই-২ডি হকআই এয়ারক্রাফ্ট

প্রায় ২৫০ মাইল পাল্লার এই রাডার শত্রুর বিমান ও জাহাজ শনাক্ত করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে কমান্ড সেন্টার ও যুদ্ধজাহাজে পাঠাতে পারে।

পি-৮এ সামুদ্রিক টহল বিমান

বাণিজ্যিক বোয়িং ৭৩৭-এর আদলে তৈরি টুইন ইঞ্জিনের এই জেট ‘পোসাইডন’ নামে পরিচিত। এটা সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের পাশাপাশি নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহে এটি ব্যবহৃত হয়।

আরসি-১৩৫ রিকনাইস্যান্স বিমান

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন সামরিক অভিযানে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আরসি-১৩৫। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার অফিসার, গোয়েন্দা তথ্য ও ফ্লাইটে রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী মিলিয়ে ৩০ জনের বেশি ক্রু বহন করতে পারে এই বিমান। বোয়িং ৭০৭-এর আদলে তৈরি চার ইঞ্জিনের এই জেট প্রায় বাস্তব সময়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।

এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন

এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন

রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত সিঙ্গেল-ইঞ্জিনের এই ড্রোন প্রধানত হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেড বোমা বহন করতে পারে এই ড্রোন, যা শত্রুর সাঁজোয়া যান বা জনবল লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের জন্যও এটি টহল দেয়।

এম-১৪২ হিমার্স

সেনাবাহিনীর এই হাই-মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম তিন অ্যাক্সেলের ট্রাকে বসানো। ‘শুট অ্যান্ড স্কুট’ পদ্ধতিতে এটি নিক্ষেপের পর দ্রুত পাল্টা হামলা এড়াতে নতুন অবস্থানে সরে যেতে পারে।

এম-১৪২ হিমার্স

মিশনের প্রয়োজনে ৩০০ মাইলের বেশি পাল্লার রকেট বহনে সক্ষম হিমার্স। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হিমার্স নিক্ষেপের ভিডিও প্রকাশ করেছে সেন্টকম।

জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ ও জাহাজ

মার্কিন বিমানবাহিনী দুই ধরনের ট্যাংকার ব্যবহার করে—কেসি-১৩৫ ও কেসি-৪৬। মার্কিন মূল ভূখণ্ড থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বি-২ বোমারু বিমানের দীর্ঘ ফ্লাইটের জন্য আকাশে জ্বালানি নেওয়া জরুরি।

ট্যাংকার বিমান কেসি-১৩৫

অন্যদিকে যুদ্ধজাহাজগুলো মূলত বেসামরিক নাবিকদের পরিচালিত সরবরাহ জাহাজ থেকে সমুদ্রে জ্বালানি নেয়। জাহাজগুলোতে জ্বালানি নেওয়ার সময় সরবরাহ জাহাজ থেকে যুদ্ধজাহাজে পানির উপর দিয়ে পাইপ লাগানো হয়, যা অনেকটা সমুদ্রের মাঝখানে চলমান একটি গ্যাস স্টেশনের মতো।

কার্গো উড়োজাহাজ

সি-১৭ গ্লোবমাস্টার জেট ও সি-১৩০ হারকিউলিস টার্বোপ্রপ ইরানে হামলায় ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও সেনাদের মধ্যপ্রাচ্যে পরিবহন করেছে।