logo

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ৭৩ বছর

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ৭৩ বছর

পুরো বিশ্বের মানুষ এখন উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ইরানের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগে থেকেই আভাস ছিল, ইরানে আঘাত হানতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে অনেকেই হয়তো জানলে অবাক হবেন, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এককালে এমন ছিল না। বরং এ দুটো দেশকে বন্ধুপ্রতিম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইসরায়েলের সঙ্গেও নীতিগতভাবে একই মিত্র ছিল ইরান, এমনকী ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া দ্বিতীয় রাষ্ট্রও ছিল ইরান। তবে এদের মধ্যে সম্পর্ক এমন পুরোপুরি অন্যদিকে ঘুরে যাওয়ার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ, জটিল ইতিহাস। 

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যবর্তী সম্পর্ক বেশ কয়েক দশক ভালো ছিল। বিশেষ করে, ১৯৫৩ সালে, ইরানের গণতন্ত্রমনা প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সুসম্পর্ক থাকে যুক্তরাষ্ট্রের। এক সময়ের বন্ধুপ্রতিম দুই দেশ কীভাবে ঘোরতর শত্রুতে পরিণত হয়েছে, সেটির একদম শুরুটা নির্ধারণ করা জটিল। 

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শুরু হিসেবে ধরা যায়। কারণ এই সময়টাতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একদিকে দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানাঘেঁষা; অন্যদিকে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি। 

বিবিসি, দ্য ইকোনমিক টাইমস, এনডিটিভি এবং হিস্টোরি হিটে প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ পর্যালোচনা করে; প্রায় ৭৩ বছরের এ সময়সীমায় মিত্রভাবাপন্ন অবস্থান আজকের এই ভয়াবহ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে মোটাদাগে উল্লেখ করা যাবে।

মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। ১৯৪১ সালে যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভিকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করে এবং তার স্থলে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে বসায়। 

মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইরানের শাহ হিসেবে শাসন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রপন্থি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতেন এবং তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু ১৯৫১ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক প্রধানমন্ত্রী হন এবং দ্রুতই সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সংস্কার শুরু করেন।

বিশেষ করে ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং সিআইএকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় কোম্পানি, যার মুনাফার বড় অংশই পেত ব্রিটেন। 

১৯৫২ সালে মোসাদ্দেক কোম্পানিটি জাতীয়করণের উদ্যোগ নিলে ব্রিটেন ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এর মাধ্যমে এটাও বোঝা যায় যে, পরবর্তী সময়ে ইরানের ওপর আরও অনেক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে চলেছে। 

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ব্রিটেনকে সংযত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু ততক্ষণে সিআইএ গোপনে মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, মোসাদ্দেক দেশকে অস্থিতিশীল করছেন এবং তার কারণে দেশে কমিউনিস্ট প্রভাব বাড়তে পারে। অবশেষে ১৯৫৩ সালের আগস্টে ব্রিটেনের সহযোগিতায় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং শাহের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়।

শাহের উৎখাত, আয়াতুল্লাহ খোমেনির ইসলামি সরকার গঠন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার ২৫ বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরশাসনের অধীনে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষ ক্রমশ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। 

পাহলভি নিজে বিপুল সম্পদ অর্জন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে খরচ করেন। সে সময় ইরানের অজস্র মানুষ দরিদ্র জীবনযাপন করছিলেন। কোনো মানুষ এ সময় পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবাদ করলেই শাহর নিজস্ব রক্ষী বাহিনী সাভাক (SAVAK) তাদের নির্মমভাবে দমন করত।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য ইরান ত্যাগ করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে। দুই সপ্তাহ পর, ইরাক থেকে নির্বাসন শেষে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি দেশে ফিরে আসেন এবং রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

১৯৭৯ সালের বিপ্লব ও জিম্মি সংকট
ধারাবাহিক ধর্মঘট ও বিক্ষোভে শাহ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জিম্মি সংকট শুরু হয় ঠিক সেই সময়, যখন নির্বাসিত শাহ ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পান। 

প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত ও অতীতের হস্তক্ষেপ মিলিয়ে ইরানি বিপ্লবীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অনেকে মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছে।

৪ নভেম্বর ১৯৭৯; একদল ইরানি ছাত্র তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে এবং ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখে। দুই সপ্তাহ পর জিম্মিদের উদ্ধারে মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি অভিযান চালায়, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়; বিমান দুর্ঘটনায় আটজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। 

১৯৮০ সালের ৭ এপ্রিল কার্টার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে শাহ মিসরে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৮০-১৯৮৮: যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন ইরাকের পক্ষে
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাক ইরানের ওপর আক্রমণ চালায়। এটি ছিল দুই দেশের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যে এক দীর্ঘকালের সংঘাত। ইরাকের শাসকগোষ্ঠী ছিল সুন্নি মুসলিম, কিন্তু দেশটির জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল শিয়া মুসলিম। অন্যদিকে ইরান পরিচালিত হতো শিয়া নেতৃত্বের মাধ্যমে এবং জনসংখ্যার বড় অংশই ছিল শিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছিল, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে তারা চাইছিল সংঘাত যেন তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। কৌশলের জায়গা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থন দেয়। এর ফলস্বরূপ, ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করে।

সাধারণত অবৈধ ও অমানবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করলেও, মার্কিন কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেন। যার ফলাফল হয়ে ওঠে ভয়াবহ, এক দীর্ঘ সংঘাতে এ ধরনের অস্ত্রের নিয়মিত প্রয়োগ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা মর্মান্তিক করে তুলতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৮৮ সালে এই যুদ্ধ শেষ হয়। এ যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি সামরিক সদস্য এবং প্রায় ১ লাখ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও নিষেধাজ্ঞা
১৯৭৯ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল ইরানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু জিম্মি সংকটের পর সবকিছু বদলে যায়। কার্টার প্রশাসন ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করে এবং ইরানের বিপুল সম্পদ জব্দ করে। ১৯৮১ সালে জিম্মি সংকটের অবসানের পর কিছু সম্পদ ফেরত দেওয়া হলেও সম্পর্ক আর আগের মতো হয়নি।

১৯৮৩ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নব্বইয়ের দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ব্যাপক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ইরানের ওপর। পরবর্তীতে যে মার্কিন রাষ্ট্রপতিরা এসেছেন, কারও দিক থেকেই ইরানের প্রতি এহেন মনোভাবের ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ইরানও সব সময় শক্ত অবস্থানেই থেকেছে সব ধরনের পরিস্থিতিতে। 

এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক ইরানির মধ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব আরও জোরদার হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও ইরানে সীমিত হয়ে গেছে। 

২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের অভিযোগ। ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করেছে। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে সাময়িক সমাধান মিললেও, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে যায়। তবে ইরান নতি স্বীকার না করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। আর সবশেষে, পরিণতি যেদিকে গড়ানোর, সেদিকেই চূড়ান্তভাবে গিয়েছে।