মাথা উঁচু করে দ্রুত ফিরব, আনন্দবাজারকে শেখ হাসিনা

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে আপাতত বাংলাদেশের ফেরত পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই ভারতের। নয়াদিল্লির এমন অবস্থানের প্রেক্ষিতে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন সাবেক প্রধামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘মাথা উঁচু করে দ্রুত দেশে ফিরব’।
মঙ্গলবার (১৯ মে) পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকা আনন্দবাজার অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন ইনিংস শুরু করেছে মোদি সরকার। তবে গত মাসে নয়াদিল্লিতে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পুনরায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের তথ্য, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা এখনও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দপ্তরের নেই।
এই পরিস্থিতিতে তার নিজের ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের দেশে ফেরা নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে মুখ খুললেন শেখ হাসিনা।
ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি নিজ দেশে ফিরেছিলেন। এর ৪৫ বছর পর ভারতে চলে আসা হাসিনার বক্তব্য, ‘আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমার দলকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু থামানো যায়নি। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।’
কিন্তু আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে কীভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব? শেখ হাসিনার ভাষ্য, ‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করার পরেও তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব চেষ্টা করে। কিন্তু উল্টো আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েই ফিরে এসেছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী মনে করছেন তাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে বলব। আমাদের কোটি কোটি সমর্থক এবং লাখো নেতাকর্মী দেশেই রয়েছেন। এখনও আমার ছাত্রলীগের ছেলেরাই অসহায় কৃষকদের পাশে রয়েছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের নেতাকর্মীরা সরব। আওয়ামী লীগ মানুষের আবেগে রয়েছে। ফলে আমাদের ফিরে আসা অনিবার্য, শুধু কিছু সময়ের ব্যাপার। আরও সংগঠিত হয়ে, শক্তিশালী হয়ে ফিরব। নীরবে তার প্রস্তুতি চলছে।’
কিন্তু আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী এই মুহূর্তে দেশের বাইরে। কলকাতাতেও রয়েছেন দলের অনেক সাবেক সংসদ সদস্যরা। শেখ হাসিনা বলছেন, ‘কেউ স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেননি। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রাণে বাঁচতে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ৬ শতাধিক নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। দেড় লাখ নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাবন্দিদের ন্যূনতম আইনি অধিকার দেওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় যারা বাইরে রয়েছেন তারা বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনে বাংলাদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। দেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন তৈরি হলেই তারা ফিরবেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন, দল তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্যায়ন কীভাবে করছেন শেখ হাসিনা? বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের বরাবরই অভিযোগ ভারত-তোষণের। হাসিনার ভাষ্য, ‘আমাদের বিরোধী শক্তিরা সর্বদাই এই অভিযোগ করেছে। আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে, দেশবিরোধী চুক্তি করেছে। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, অন্তর্বর্তী সরকার অথবা বর্তমান বিএনপি সরকার এখনও পর্যন্ত একটিও দেশবিরোধী চুক্তি সামনে হাজির করতে পারেনি। তাদের মিথ্যাচার প্রমাণিত হচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আমরা গঙ্গা পানি চুক্তি করেছিলাম। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভারতের থেকে প্রায় ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ করেছিলাম। ২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা গিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনটি এই জ্বালানি সংকটের সময় বাংলাদেশের ‘লাইফ লাইন’। এর মধ্যে কোনটা অন্য দেশের তাঁবেদারি বিএনপি বলুক? এটা ঘটনা যে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।’
