logo

দুর্বৃত্তের গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের যত নিহত-আহতের ঘটনা

দুর্বৃত্তের গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের যত নিহত-আহতের ঘটনা

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস যেমন বর্ণিল, তেমনি রয়েছে কিছু বিষাদময় অধ্যায়। একজন দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ড প্রতিদিনকার কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু যখন এমন কোনো ঘটে, তখন এর প্রভাব পুরো দেশ এবং বিশ্বজুড়ে অনুভূত হয়। এমনকি এ প্রভাব কয়েক দশক ধরে বজায় থাকে। আমেরিকার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত চারজন দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টকে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে। যদিও আরও অনেকেই তাদের প্রাণনাশের চেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছেন।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল ব্যক্তি বিশেষের মৃত্যু ছিল না, বরং এগুলো আমেরিকার রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। দায়িত্বরত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই হামলাগুলো কীভাবে ঘটেছিল এবং কোন প্রেসিডেন্টরা হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন— এই প্রতিবেদনে বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারত তুলে ধরা হয়েছে। 

ইতিহাসের চার ট্র্যাজেডি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নথিপত্র অনুযায়ী, দায়িত্বরত অবস্থায় যে চারজন প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে তারা হলেন—আব্রাহাম লিংকন, জেমস এ গারফিল্ড, উইলিয়াম ম্যাককিনলে এবং জন এফ কেনেডি। ১৮৬৫ সালে দাস প্রথা বিলুপ্তির কারিগর আব্রাহাম লিংকনকে হত্যার মাধ্যমে এই কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর ১৮৮১ সালে জেমস এ গারফিল্ড এবং ১৯০১ সালে উইলিয়াম ম্যাককিনলে আততায়ীর হামলার শিকার হন। সর্বশেষ ১৯৬৩ সালে টেক্সাসের ডালাসে জন এফ কেনেডিকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যা আজও বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রহস্যময় ঘটনা।

আব্রাহাম লিংকন হত্যাকাণ্ড

১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল, গৃহযুদ্ধের সংকট থেকে দেশকে টেনে তোলার ঠিক পরেই প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ওয়াশিংটন ডিসির ফোর্ডস থিয়েটারে একটি নাটক উপভোগ করছিলেন। প্রদর্শনী চলাকালীন, জন উইকস বুথ নামে একজন কনফেডারেট সমর্থক এবং সুপরিচিত অভিনেতা চুপিচুপি লিংকনের ব্যক্তিগত বক্সে ঢুকে পড়ে এবং প্রেসিডেন্টের মাথার পেছনে খুব কাছ থেকে গুলি করে।

বুথ প্রাথমিকভাবে লিংকনকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোটাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করায় বর্বর হত্যার পথ বেছে নেয়। এরপর টানা ১২ দিনের তল্লাশি শেষে ভার্জিনিয়ার একটি শস্যাগারে মার্কিন সৈন্যদের হাতে বুথ নিহত হন।

কেন লিংকনকে হত্যা করা হয়?

১৮৬০ সালের নভেম্বরে দাসপ্রথা বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির হয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট হন। পরের বছর মধ্যেই দক্ষিণ অঞ্চলের ১১টি অঙ্গরাজ্য আলাদা হয়ে ‘কনফেডারেট স্টেটস অফ আমেরিকা’ গঠন করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দাসভিত্তিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা। মূলত এর মধ্য দিয়ে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।

চার বছরের তিক্ত লড়াইয়ের পর ১৮৬৫ সালের ৯ এপ্রিল গৃহযুদ্ধের এক প্রকার সমাপ্তি ঘটে। বুথ দক্ষিণের কনফেডারেট স্টেটসের পক্ষে ছিলেন। তিনি এই পরাজয় মেনে নিতে পারেননি। তার ধারণা ছিল, লিংকন ‘মুক্তির ঘোষণা’ জারির মাধ্যমে দাসদের মুক্তি দিয়ে এই সংঘাত উসকে দিয়েছিলেন। ১৮৬৪ সালে লিংকনের পুনর্নির্বাচিত হওয়া এবং দাসপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী প্রবর্তনেরও ঘোরবিরোধী ছিলেন বুথ।

লিংকনকে হত্যার মাধ্যমে মূলত গৃহযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ায় ছিল বুথের উদ্দেশ্য। কনফেডারেট আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বুথ, তবে তা আর হয়ে ওঠেনি।

জেমস এ গারফিল্ড হত্যাকাণ্ড

তখনও লিংকনের মৃত্যুর ২০ বছর পার হয়নি। ১৮৮১ সালের ২ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসির একটি ট্রেন স্টেশনে গুলিবিদ্ধ হন প্রেসিডেন্ট জেমস এ গারফিল্ড। তখন তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মাত্র চার মাস চলছিল। চার্লস জে গুইটো নামের একজন ব্যর্থ আইনজীবী তীব্র ক্ষোভ থেকে তাকে গুলি করেছিলেন। 

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, গুইটো মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তিনি মনে করতেন, গারফিল্ড প্রশাসনে তার একটি রাজনৈতিক পদ পাওয়া উচিত। তার অনুরোধ উপেক্ষা করা হলে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট চেস্টার এ আর্থারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে হত্যার পথ বেছে নেন। আর্থার ছিলেন ‘স্পয়েল সিস্টেম’-এর সমর্থক। এই সিস্টেমে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে সরকারি চাকরি দেওয়া হতো। গুইটো ভেবেছিলেন গারফিল্ডকে হত্যা করলে তার পথ সহজ হবে। 

জেমস গারফিল্ড প্রেসিডেন্ট মেয়াদের মাত্র চার মাস পরে একটি রেলস্টেশনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য।

কিন্তু তার সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। গারফিল্ডকে গুলির পর দ্রুত তাকে ধরে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। ১৮৮২ সালের ৩০ জুন গুইটোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গারফিল্ডের মৃত্যুর ফলে ১৮৮৩ সালে ‘পেন্ডেলটন সিভিল সার্ভিস রিফর্ম অ্যাক্ট’ পাস হয়। এই অ্যাক্টের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে দুর্নীতির বদলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

উইলিয়াম ম্যাককিনলে হত্যাকাণ্ড

১৯০১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের বাফেলোতে এক জনসমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলে বক্ত্য দিচ্ছিলেন। এ সময় লিওন সজোলগোস নামের এক অরাজকতাবাদী প্রেসিডেন্টকে খুব কাছ থেকে দুবার গুলি করেন। আহত অবস্থায় প্রেসিডেন্টকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে এক সপ্তাহ ধরে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষত স্থানে দ্রুত পচন ধরায় ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। 

নিউইয়র্কের বাফেলোতে নৈরাজ্যবাদী লিওন জোলগোসের গুলিতে নিহত হন উইলিয়াম ম্যাককিনলি।

ওই সময় ঘাতক সজোলগোসকে ঘটনাস্থলেই ধরা হয়। ১৯০১ সালের ২৯ অক্টোবর ইলেকট্রিক চেয়ারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সজোলগোস পুঁজিবাদ ও সরকারের বিরোধী ছিলেন এবং ম্যাককিনলেকে করপোরেট লোভের প্রতীক মনে করতেন। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে থিওডোর রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট হন। এই ঘটনার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে সিক্রেট সার্ভিসকে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড

১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর টেক্সাসের ডালাসে মোটর শোভাযাত্রার সময় জন এফ কেনেডিকে দুবার গুলি করা হয়। আহত অবস্থায় কেনেডিকে হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৪ বছর বয়সি সাবেক মেরিন সেনা লি হার্ভে অসওয়াল্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিচারের আগেই জ্যাক রুবি নামের এক নাইট ক্লাব মালিকের হাতে অসওয়াল্ড নিহত হওয়ায় বিষয়টি রহস্যময় হয়ে ওঠে। 

১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ডালাসে পৌঁছানোর পর জন এফ কেনেডি তার স্ত্রী জ্যাকুলিন এবং টেক্সাসের গভর্নর জন কনালির সঙ্গে একটি মোটর শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

এ পরিস্থিতিতে অনেক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব তৈরি হয়। কারও কারও মতে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাফিয়া চক্র ছিল, আবার কেউ সিআইএ বা এফবিআইকে দায়ী করেন। যদিও ওয়ারেন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত অনুযায়ী অসওয়াল্ড একাই এই কাজ করেছিলেন বলে জানানো হয়, তবে তার উদ্দেশ্য নিয়ে আজও বিতর্ক রয়ে গেছে।

হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন যেসব প্রেসিডেন্ট

চারজন নিহত হলেও আরও কয়েকজন প্রেসিডেন্ট মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। প্রতিটি চেষ্টা প্রমাণ করে যে, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই পদে থাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। শনিবার (২৫ এপ্রিল) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ওয়াশিংটনের হোটেল হিলটনে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্ট ডিনারে গুলির ঘটনায় এই পদের বিশষত্ব নিয়ে আবারও আলোচনা সামনে এসেছে। 

আরও সাতজন দায়িত্বরত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছেন। তারা হলেন-

অ্যান্ড্রু জ্যাকসন: ১৮৩৫ সালে একজন আততায়ী খুব কাছ থেকে জ্যাকসনকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার দুটি পিস্তলই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় (গুলি বের হয়নি)। এরপর জ্যাকসন তার হাতের লাঠি দিয়ে উল্টো সেই আততায়ীকে আক্রমণ করেছিলেন।

থিওডোর রুজভেল্ট: ১৯১২ সালে তৃতীয় মেয়াদের নির্বাচনি প্রচারণার সময় রুজভেল্টের বুকে গুলি করা হয়েছিল। আহত হলেও তিনি এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যান।

ফ্র্যাংকলিন ডি রুজভেল্ট: ১৯৩৩ সালে জিউসেপ্পে জাঙ্গারা নামের একজন আততায়ী তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তার ছোড়া গুলি রুজভেল্টের গায়ে না লাগলেও শিকাগোর মেয়র আন্তন চেরমাক এ ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।

হ্যারি এস ট্রুম্যান: ১৯৫০ সালে দুইজন পুয়ের্তো রিকান জাতীয়তাবাদী ব্লেয়ার হাউসে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। ওই সময় ট্রুম্যান ব্লেয়ার হাউসে অবস্থান করছিলেন। নিরাপত্তারক্ষীদের হামলা পাল্টা-হামলায় একজন নিহত হয় এবং অন্যজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জেরাল্ড ফোর্ড: ১৯৭৫ সালে মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে ফোর্ডকে হত্যার দুটি পৃথক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু দুবারই তিনি বেঁচে যান।

রোনাল্ড রিগ্যান: জন হিংকলে জুনিয়র নামের একজন আততায়ী ১৯৮১ সালে রিগ্যানকে গুলি করেন, এতে তিনিসহ আরও তিনজন আহত হন। প্রেসিডেন্ট পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই ঘটনা ঘটেছিল ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত হোটেল হিলটনে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প: শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাতে হিলটনে সংবাদিকদের নৈশভোজ অনুষ্ঠানে গুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ অন্য নেতারাও ইপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় একজন নিরাপত্তকার্মী হালকা আহত হয়েছেন। কড়া নিরাপত্তা থাকায় তেমন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।  

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেনসিলভেনিয়ার বাটলার (জুলাই ২০২৪) এবং ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে (সেপ্টেম্বর ২০২৪) হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছেন। যদিও এই ঘটনাগুলো ট্রাম্পের দুই মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে ঘটেছিল।