যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় মাথাব্যথা হয়ে উঠছে হরমুজ প্রণালি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না যে হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা হয়েছে। তবে যদি তা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলাই ভালো।’ ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন সামরিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এই সতর্কবার্তা এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান হয়তো প্রণালিতে মাইন বসাচ্ছে, অথবা তা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, তারা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের প্রায় ১৬টি মাইন বসানোর জাহাজে হামলা চালিয়েছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতিতে উভয়পক্ষের আগ্রহের কেন্দ্র এই প্রণালিটি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এটি একটি সংকীর্ণ কৌশলগত পথ। এর প্রস্থ মাত্র ৩৪ কিলোমিটার, যার এক পাশের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। কুয়েত, ইরাক, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই পথ দিয়েই যেতে হয়। উপসাগর থেকে বের হওয়ার জন্য এটিই তাদের একমাত্র সমুদ্রপথ। ফলে ইরানের হাতে এখানে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অনেকবার বলেছে যে তারা ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে বা প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ট্যাংকার চলাচল হুমকির মুখে ফেলতে ইরানের প্রচলিত যুদ্ধজাহাজের প্রয়োজন নেই। তারা ছোট সাবমেরিন বা দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করেও এটি করতে পারে।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে হামলা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ফলে অনেক জাহাজের মালিক ঝুঁকি না নিয়ে হরমুজ প্রণালির প্রান্তে জাহাজ নোঙর করে যুদ্ধ থামার অপেক্ষা করছে। ফলে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ কমে গেলে এবং চাহিদা বাড়তে থাকলে দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। যার প্রভাব পড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
কার্বনচেইনের সরবরাহ শৃঙ্খলবিষয়ক বিশ্লেষক ইসমাইল জাবিয়েভ আলজাজিরাকে বলেন, ‘মূল বিষয়টি হলো ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালি ও সস্তা ড্রোনের কথা ভাবুন। এখানে প্রত্যক্ষ অবরোধ নেই। ইরান সমুদ্রের ওপর দেয়াল তোলেনি। কিন্তু ঝুঁকি রয়েছে। সব ড্রোন ঘাঁটি ধ্বংস হলেও গোপনভাবে ড্রোন হামলা চালানো সম্ভব। তাই সংঘাত চলতে থাকলে সরবরাহ ব্যাহত হবেই।’
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল যায়, তার প্রায় ৮৯ শতাংশই এশিয়ার বাজারে পৌঁছে। প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথে তেল রপ্তানি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেই সুযোগ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরকে সংযুক্ত করে, যা হরমুজ প্রণালি এড়ানোর অন্যতম পথ। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে প্রায় ৬ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেলই এই প্রণালি দিয়ে গেছে।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাভেকাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলো সর্বোচ্চ অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল অন্যপথে পরিবহন করতে পারবে। কিন্তু তবুও যদি বেশির ভাগ ট্যাংকার চলাচল বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।