খামেনি হত্যার পর ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বিচ্ছিন্ন, বিস্তৃত হতে পারে যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নেতৃত্ব হারিয়ে ইরানের মিত্রদের কার্যক্রম একরকম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যেখানে প্রত্যেকেই এখন আত্মরক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নিজেই আত্মরক্ষা করতে সক্ষম এবং তাদের মিত্র বাহিনীর সাহায্য প্রয়োজন নেই।’
তবে তাদের মিত্ররা এরই মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। কিন্তু এই কার্যকলাপে ইরানের সঙ্গে তারা কতটা সমন্বয় করতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। বরং, অনেকেই মনে করছেন, এই মুহূর্তে মিত্রশক্তিগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইরান। মিত্ররাও এখন নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে বিস্তৃত হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ।
হিজবুল্লাহ: ইরানের শক্তিশালী মিত্র হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ যুদ্ধে নেমেছে ইরানের জন্য নয়, তারা যুদ্ধ করছে আত্মরক্ষার জন্য।
সোমবার (২ মার্চ) উত্তর ইসরায়েলের দিকে বেনরুটে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। খামেনির হত্যার প্রতিবাদ হিসেবে এ হামলার কথা বলা হলেও হিজবুল্লাহর হামলার প্রতিক্রিয়ায় বেনরুটের দক্ষিণাঞ্চল এবং বেক্কা ভ্যালিতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহ হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য এই আগাম হামলা চালিয়েছে।
হুথি: দ্বিমুখী সংকটের মুখে ইরানের আরেক মিত্র ইয়েমেনে হুথি বাহিনী। ইরানে হামলার প্রতিবাদে তারা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং লোহিত সাগরের নৌপরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত করেছে। তবে এখন তাদের নিজ দেশেই সংকট চলছে। ইয়েমেনের সরকার সম্প্রতি রাজধানী সানা পুনর্দখলের হুমকি দিয়েছে। ফলে হুথিদের জন্য ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামা মানে সানা হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি।
ইরাক: ইরাকের ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বাহিনী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়ায়, তাদের হামলা শুধু মিলিশিয়া যুদ্ধ নয়, সরাসরি ইরাক-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
নেতৃত্ববিহীন প্রতিরোধ: খামেনি হত্যার ফলে প্রতিরোধ অক্ষের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে গেছে। এই নেটওয়ার্ক কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। প্রথমত, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আদর্শিক ক্ষমতা, দ্বিতীয়ত, আইআরজিসির লজিস্টিক সক্ষমতা এবং তৃতীয়ত, সিরিয়ার মাধ্যমে ভৌগোলিক সংযোগ। এখন তার সবগুলোই ভেঙে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কমান্ড না থাকলেই যে কার্যক্রম থেমে যাবে, তা নয়, বরং এর মানে বিশৃঙ্খলা। লেবাননে হিজবুল্লাহ আগাম হামলা চালাচ্ছে, ইয়েমেনে হুথিরা অভ্যন্তরীণ হুমকির মুখে এবং ইরাকে মিলিশিয়ারাও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জটিলতার মধ্যে পতিত। এসব পরিস্থিতি এই বিশৃঙ্খলাকেই স্পষ্ট করছে।
তবে ইরানের বার্তা স্পষ্ট। তারা বলছে, এই যুদ্ধে তারা একা লড়ছে। আর যখন তেহরানের নির্দেশ আসা বন্ধ হয়েছে, পুরো অঞ্চলে অনিশ্চয়তা ও বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ এখন আর কোনো সমন্বিত বাহিনী নয়, তারা এখন সবাই আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের সামর্থ্য ও সুবিধামতো বিচ্ছিন্নভাবেই কাজ করছে। আর এর ফলে ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
আলজাজিরায় প্রকাশিত “খামেনিস কিলিং লিভস ইরানস ‘এক্সিস’ ইন ডিজঅ্যারে অ্যাজ ওয়ার ওয়াইডেনস” শীর্ষক বিশ্লেষণ ফিচার প্রতিবেদন অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন।