logo

বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর টার্গেট মুসলিম ভোট 

বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর টার্গেট মুসলিম ভোট 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৩ এপ্রিল। এই দফায় রাজ্যের ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। আর দ্বিতীয়ও শেষ দফায় ১৪২ আসনে নির্বাচন হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। নির্বাচনের আগে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রচারণা শুরু করেছে। ভোটারদের টানতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন তারা। তবে এবার নির্বাচনে হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যে তাদের টার্গেট মুসলিম ভোটাররা।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। একটা সময় এই মুসলিম ভোট ব্যবহার করেই ক্ষমতায় এসেছিল বামপন্থিরা। ২০১১ সালে রাজ্যটিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই মুসলিমরাই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ভোট ব্যাংক। এই নিয়ে রাজ্যটির প্রধান বিরোধী দল বিজেপি শাসক দলের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণ নীতির অভিযোগও তুলে থাকে। ফলে একদিকে তৃণমূল যেমন তাদের ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে চেষ্টা করছে, তেমনি বামেরাও নতুন করে মুসলিমদের মন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

আসন্ন নির্বাচনে ঈদ মঞ্চকে ব্যবহার করে সুকৌশলে জনসংযোগ সারল তৃণমূল ও বামেরা। যদিও এক্ষেত্রে বেশ দূরে ছিল বিজেপির প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে প্রার্থী তালিকায় তৃণমূলের সংখ্যালঘু মুখ ৪২ জন, আইএসএফ, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, সিপিআইএমসহ বাম দলগুলোও একাধিক মুসলিমকে প্রার্থী করেছে। তবে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় নেই কোনো মুসলিম। অন্যদিকে কংগ্রেস এখনও প্রার্থী তালিকা ঘোষণাই দিতে পারেনি। 

গত ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের জামাতে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ডান-বাম প্রার্থীরা। 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা ব্যানার্জি প্রথম এই কর্মসূচি শুরু করেন। নিজের ভাতিজা ও দলের সংসদ সদস্য অভিষেক ব্যানার্জিকে সঙ্গে নিয়ে রেড রোডে ঈদের নামাজে অংশ নেন মমতা। সেখানে দেওয়া বক্তব্যে যেমন কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে নিশানা করেছেন, ঠিক তেমনিই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে থাকার বার্তা দেন তিনি।

এ সময় মমতা বলেন, ‘এসআইআরে আপনাদের অনেক নাম কাটা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আমার প্রত্যাশা আপনাদের সম্মান সুরক্ষিত থাকবে। আপনাদের সঙ্গে যদি কেউ নাও থাকে, আমি সমস্ত জাতির পরিবারের সদস্য হিসেবে আপনাদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার লড়াই চালিয়ে যাব।’ 

শিশুদের হাত থেকে গোলাপ ফুল গ্রহণ করছেন মমতা ব্যানার্জি। ছবি: সংগৃহীত

রেড রোডে ঈদের নামাজ শেষে কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত কলিন লেন, রিপন স্ট্রিট ও বেক বাগানের বাসিন্দাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জিও। শিশুদের হাত থেকে গোলাপ গ্রহণ করেন মমতা ব্যানার্জি। তিনিও শিশুদের কোলে তুলে নিয়ে আদর করেন। অর্থাৎ এসবের মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘুদের কাছে আস্থা রাখার বার্তা দিয়েছেন দলনেত্রী। 

এমনকি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে মমতা ব্যানার্জি লেখেন, ‘সবার ভালোবাসা ও আশীর্বাদে আমি আবেগাপ্লুত। সম্প্রীতির মেলবন্ধনে একত্রিত থাকুক এই বাংলা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একতাই আমাদের পথ চলার মূলমন্ত্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই বাংলা সম্প্রীতির বার্তা বহন করে আসছে, আমার বিশ্বাস আগামী দিনেও দৃঢ় হবে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন। এই ভূমির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিই আমাদের সৌভ্রাতৃত্বকে অটুট রেখেছে। বাংলার এই সংস্কৃতি বিনষ্ট করতে উদ্যত বাংলা-বিরোধী দল। আমি আশাবাদী, এই বাংলায় কোনও স্বৈরাচারী শক্তি জয়লাভ করবে না। আপসহীন লড়াই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ এবং এগিয়ে চলার উপজীব্য। তাদের অপশক্তি, ক্রূরতা, হিংস্রতা, কুৎসা-অপপ্রচার এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ জবাব দেবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী দিনে অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়বে বাংলা।’ 

অন্যদিকে বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র দেখা গেছে। ফলে সংখ্যালঘু মুসলিমদের মন পেতে চেষ্টায় কোন কমতি রাখতে চান না প্রার্থীরা। 

উত্তর দমদম বিধানসভা কেন্দ্রে বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআইএম প্রার্থী দীপশীতা ধর ঈদের দিন ফতুল্লাপুরে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তবে তার অভিযোগ, ‘এই অঞ্চলের প্রচুর মানুষ আছে যারা ৪০-৫০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন, অনেকে সামরিক দপ্তরেও কাজ করেছেন। এরকম মানুষদের বেছে বেছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।’ 

পাণ্ডুয়া বিধানসভার অন্তর্গত জিটি রোডে ঈদের নামাজে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সমীর চক্রবর্তী। মুসল্লিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনিও। ভোটের আগে জনসংযোগই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সেখানে দেখা যায় সংসদ সদস্য রচনা ব্যানার্জিকেও। ঈদের মঞ্চ থেকেই তৃণমূল প্রার্থীকে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী করে মমতা ব্যানার্জির হাতকে শক্ত করার আহ্বান জানান রচনা।

ঈদের সকালে বাঁকুড়ার মাচানতলা জামে মসজিদে উপস্থিত থেকে জনসংযোগ সারেন সিপিআইএম প্রার্থী অভয় মুখার্জি। পরে সেখানেই আসেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অনুপ মণ্ডলও। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দুই প্রার্থী নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেন। সঙ্গে ছিলেন দুই দলের কর্মী ও সমর্থকরা। 

পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল শহরের মুরগাসল ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন স্কুল প্রাঙ্গণে ঈদের জামাতে উপস্থিত ছিলেন আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ও রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটক। নামাজ শেষে সংখ্যালঘু ভোটারদের সঙ্গে দেখা করে তাদের ঈদের শুভেচ্ছা জানান। পরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মলয় ঘটক বলেন, ‘আমরা আশা করব, আগামী দিনেও উন্নয়নের ধারা বজায় থাকবে এবং মমতা ব্যানার্জি পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।’ 

হুগলি জেলার রিষড়ার ওয়েলিংটন জুট মিলে ঈদের নামাজে দেখা যায় শ্রীরামপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষ, সিপিআইএম প্রার্থী নবনীতা চক্রবর্তীকে। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জিও। প্রত্যেকেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। 

রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের ধর্মীয় উৎসবে একই মাঠে দেখা হয় কামারহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মদন মিত্র, ওই কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী মানস মুখার্জি, পানিহাটি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষের। উপস্থিত ছিলেন দমদম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সংসদ সদস্য সৌগত রায়ও। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি সকল প্রার্থীরাই অত্যন্ত কৌশলে ঈদের জামাতকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করলেন।  

বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে সকাল সকাল মসজিদে পৌঁছান ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী অজিত মাহাতো। ঈদের দিনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রচারেও জোর দেন তিনি। এদিন সকালে গোপীবল্লভপুর-২ নম্বর ব্লকের বড় আসনবনী ও জাহানপুর গ্রামের দুটি মসজিদে যান অজিত মাহাতো। সেখানে উপস্থিত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ও ঈদের শুভেচ্ছা জানান। 

তবে তৃণমূল ও বামদের দেখা গেলেও বিজেপি প্রার্থীদের সেভাবে ঈদের নামাজে উপস্থিত থেকে জনসংযোগ করতে দেখা যায়নি।