কেনেডি সেন্টার থেকে সরানো হলো ট্রাম্পের নাম

আদালতের আদেশে ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী পারফর্মিং আর্টস ভেন্যু কেনেডি সেন্টার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। শনিবার (১৩ জুন) ফেডারেল আদালতকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। তবে ট্রাম্পের নামফলক সরিয়ে ফেলা হলেও সেন্টারের সম্মুখভাগটি একটি টার্পুলিন বা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
কেনেডি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ম্যাট ফ্লোকা আদালতে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, ট্রাস্টি বোর্ড ও সেন্টার কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলেছে। ভবনের সামনের পোর্টিকোসহ মাঠের ভেতরে যেখানে কেনেডি সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ট্রাম্পের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই সমস্ত সাইনেজ ও নামফলক সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবন থেকে ট্রাম্পের নাম মুছে ফেলার এই ঐতিহাসিক ও প্রতীকী মুহূর্তটি দেখতে গত দুই দিন ধরে সেন্টারের সামনের প্লাজায় ভিড় জমিয়েছিলেন সাধারণ মানুষরা। তবে কাজ চলায় মাচার চারপাশে শক্ত করে ত্রিপল টানানো থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি ভেতরের দৃশ্য দেখা সম্ভব হয়নি।
পরে এক সংবাদকর্মী ত্রিপলের সামান্য ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে নিশ্চিত করেছেন, দেয়াল থেকে ট্রাম্পের নামের অক্ষরগুলো আসলেই খুলে ফেলা হয়েছে। তবে কয়েক দশক ধরে অক্ষুণ্ণ থাকা আসল নাম—‘দ্য জন এফ কেনেডি মেমোরিয়াল সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস’ ঠিক কখন সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেনেডি সেন্টারের নেতৃত্ব ভবন থেকে ট্রাম্পের নাম মুছে ফেলার একটি ফেডারেল বিচারকের আদেশের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু দুটি আদালতই তাদের আপিল আবেদন খারিজ করে দেয়। এমনকি শুক্রবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে তীব্র বজ্রঝড়ের অজুহাত দেখিয়ে শনিবার দুপুরের ডেডলাইন আরও কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল কর্তৃপক্ষ, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
ট্রাম্পের নাম অপসারণের এই সিদ্ধান্তকে বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা। এই নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মামলা করা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও ওহাইওর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জয়েস বিটিকে শুক্রবার রাতে ও গতকাল শনিবার সকালে অনুষ্ঠানস্থলের প্লাজায় বেশ উৎফুল্ল মেজাজে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেনেডি সেন্টারের একটি হলে তার ‘ট্রাম্প ডান্স’ দেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
এক বিবৃতিতে জয়েস বিটি বলেন, এই বিজয় কেনেডি সেন্টারকে আমেরিকার জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ। এখানে আইনের শাসন জয়ী হয়েছে, যা সত্যিই উদযাপনের যোগ্য।
দর্শনার্থীরাও এই সিদ্ধান্তে স্বস্তিবোধ করছেন। ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা ও সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির সদ্য স্নাতক লিও বার্থোলোমাউস জানান, হোয়াইট হাউসের ইউএফসি ম্যাচ সংক্রান্ত অনুষ্ঠান দেখতে এসে তিনি কেনেডি সেন্টারের এই পরিবর্তনের খবর পান। তিনি বলেন, ‘আমার দাদী শিল্পমনা মানুষ ছিলেন। আমি নিজেও এখানে এসে বিখ্যাত ‘দ্য লায়ন কিং’ শো দেখেছি। ট্রাম্প এখানে নিজের নাম জুড়ে দেওয়াটা আমি মোটেও পছন্দ করিনি। প্রতিষ্ঠানটি ‘কেনেডি সেন্টার’ হিসেবে সবচেয়ে বেশি মানানসই।’
ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কেনেডি সেন্টার থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম মুছে ফেলার এই আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত মূলত গত বছরের শেষভাগে। ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ে এই কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করেন এবং নিজেই এর প্রধান হন। পরে ডিসেম্বর মাসে এই বোর্ড একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ১৯৬৪ সাল থেকে চলে আসা ‘দ্য জন এফ কেনেডি মেমোরিয়াল সেন্টারের’ নাম পরিবর্তন করে এর সঙ্গে ট্রাম্পের নাম জুড়ে দেয় এবং ভবনের মূল প্রবেশদ্বারে নতুন নামফলক বসায়। প্রয়াত সাবকে প্রেসিডেন্ট কেনেডির স্মৃতি বিজড়িত এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে কেনেডি পরিবার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জয়েস বিটি ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলাকারীদের অভিযোগ ছিল, এই প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের বিশেষ আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং নামাঙ্কিত হয়েছিল। তাই সংসদের অনুমোদন ছাড়া ট্রাস্টি বোর্ড একক ক্ষমতাবলে এর নাম পরিবর্তন করতে পারে না। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে গত মে মাসে ফেডারেল আদালত রায় দেয়, বোর্ড নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন লঙ্ঘন করেছে। তাই ট্রাম্পের নাম যুক্ত করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আদালত নামফলক সরানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিলে কেনেডি সেন্টারের বর্তমান নেতৃত্ব তা বজায় রাখার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপিল করে ব্যর্থ হয়। অবশেষে আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে শনিবার (১৩ জুন) দুপুরের ডেডলাইনের মধ্যে ভবনের সম্মুখভাগ থেকে ট্রাম্পের নামফলকটি সম্পূর্ণ অপসারণ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
